
দৈনিক রিপোর্ট ডেস্ক:
সাম্প্রতিক বন্যায় চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং তিন পার্বত্য জেলায় প্রাণিসম্পদ খাতে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, এ খাতে মোট ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৭৭ কোটি ১৫ লাখ ২ হাজার ২৪০ টাকা। প্রাণ হারিয়েছে ১ লাখ ৬১ হাজার ৩৯৪টি গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগি। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩৩ লাখ ৩৩ হাজার ৬৪২টি প্রাণিসম্পদ এবং ১০ হাজার ৯৯১টি খামার।
গ্রামীণ অর্থনীতিতে গরু, ছাগল, হাঁস কিংবা মুরগি শুধু সম্পদ নয়—অনেক পরিবারের জন্য এগুলোই ছিল জীবিকার প্রধান অবলম্বন। সন্তানদের পড়াশোনা, চিকিৎসা কিংবা জরুরি প্রয়োজন মেটাতে এসব প্রাণিসম্পদের ওপর নির্ভর করতেন অনেকে। ভয়াবহ বন্যায় সেই শেষ সম্বল হারিয়ে এখন অসহায় অবস্থায় দিন কাটাচ্ছেন ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিভাগের পাঁচ জেলার ৪৫টি উপজেলার ১৯১টি ইউনিয়নে প্রাণিসম্পদ খাতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে চট্টগ্রাম জেলা, যেখানে আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ৬০ কোটি ৬ লাখ ৮১ হাজার ১৪০ টাকা। এছাড়া কক্সবাজারে ১৩ কোটি ৫৩ লাখ ৯১ হাজার ১১০ টাকা, রাঙামাটিতে ২ কোটি ৯৯ লাখ ৮২ হাজার টাকা, বান্দরবানে ১৭ লাখ ৪৭ হাজার টাকা এবং খাগড়াছড়িতে ৩৭ লাখ ১ হাজার টাকা ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে।
বন্যার সবচেয়ে বড় ধাক্কা সামলাতে হচ্ছে ছোট ও মাঝারি খামারিদের। ক্ষতিগ্রস্ত ১০ হাজার ৯৯১টি খামারের মধ্যে ৪ হাজার ৭৫৬টি গবাদিপশুর খামার এবং ৬ হাজার ২৩৫টি হাঁস-মুরগির খামার রয়েছে। এসব খামারে ক্ষতির পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা ছাড়িয়েছে।
বন্যার পানিতে শুধু প্রাণিসম্পদ নয়, বিপুল পরিমাণ পশুখাদ্যও নষ্ট হয়েছে। প্রায় ৯১০ টন দানাদার খাদ্য, ১৪ হাজার ২৬৫ টন খড় এবং ৯ হাজার ১২৯ টন ঘাস নষ্ট হওয়ায় খামারিরা নতুন সংকটে পড়েছেন। মৃত গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির কারণে আলাদাভাবে কয়েক কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
চট্টগ্রাম জেলার ১৫টি উপজেলায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে। এখানে ৪ হাজার ২১৮টি পশুর খামার এবং ৫ হাজার ৬৭৪টি হাঁস-মুরগির খামার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি পশুখাদ্য, ঘাস ও অন্যান্য উপকরণ নষ্ট হওয়ায় আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে।
বন্যার কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান ও রাঙামাটির বিস্তীর্ণ চারণভূমি পানির নিচে তলিয়ে যায়। এতে ৭১টি গরু, ১৬৫টি ছাগল, ৫০টি ভেড়া, ১ লাখ ৫৮ হাজার ৬০০টি মুরগি এবং ২ হাজার ৫০৮টি হাঁস মারা যায়। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম জেলাতেই সবচেয়ে বেশি প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
এছাড়া বন্যার পর বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৩৯০টি গরু, ৪ হাজার ৭৫৫টি মহিষ, ১ লাখ ৬০ হাজার ৮৭টি ভেড়া, ২৮ লাখ ৪৫ হাজার ৮২৮টি মুরগি এবং ৭০ হাজার ৩৭০টি হাঁস। ইতোমধ্যে হাজার হাজার পশু-পাখির চিকিৎসা ও টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনা করেছে প্রাণিসম্পদ বিভাগ।
বন্যার আঘাতে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও বান্দরবানের কয়েকটি প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার ফলে মাঠপর্যায়ের সেবাদান কার্যক্রমও কিছুটা ব্যাহত হয়েছে।
বাঁশখালীর ক্ষতিগ্রস্ত বাসিন্দারা জানান, বন্যায় শুধু ঘরবাড়িই নয়, জীবিকার প্রধান অবলম্বনও হারিয়েছেন তারা। কারও গরু-ছাগল মারা গেছে, কারও হাঁস-মুরগির খামার ধ্বংস হয়েছে, আবার অনেকের মাটির ঘর ভেঙে পড়েছে। নতুন করে জীবন শুরু করা তাদের জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
চট্টগ্রাম বিভাগীয় প্রাণিসম্পদ দপ্তরের উপ-পরিচালক (ভেটেরিনারি পাবলিক হেলথ) ডা. মুহাম্মদ ইজমাল হাসান জানান, মাঠপর্যায়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে প্রাণিসম্পদ খাতে ৭৭ কোটি ১৫ লাখ টাকারও বেশি ক্ষয়ক্ষতির হিসাব পাওয়া গেছে।
প্রাণিসম্পদের পাশাপাশি বন্যায় চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি, কৃষিজমি, সড়ক এবং নিরাপদ পানির উৎসও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক স্থানে এখনো বিশুদ্ধ পানির সংকট রয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সাত জেলায় বন্যায় এ পর্যন্ত ৫৮ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং ১২ লাখের বেশি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। ত্রাণ কার্যক্রম চললেও ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য পুনর্বাসন এবং জীবিকা পুনরুদ্ধার এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বন্যার পানি নেমে গেলেও খালি গোয়ালঘর, ধ্বংস হওয়া খামার এবং হারানো জীবিকার বেদনা এখনো কাটেনি। নতুন করে ঘুরে দাঁড়াতে ক্ষতিগ্রস্ত খামারিদের জন্য দ্রুত পুনর্বাসন ও সহায়তার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
