স্কুলশিক্ষার্থীদের জন্য নিজেদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) টুলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল। এখন থেকে কিন্ডারগার্টেন থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত (কে-১২) শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্টে এসব সুবিধা নিষ্ক্রিয় থাকবে। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষ চাইলে নিজস্ব সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এআই টুলগুলো চালু করতে পারবে।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে বার্তা সংস্থা এএফপি।
গুগল মঙ্গলবার এক ব্লগ পোস্টে জানায়, শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্টে জেমিনি, জেমিনি নোটবুক, গুগল ক্লাসরুমে জেমিনি এবং এআই-সংশ্লিষ্ট সার্চ সুবিধাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ রাখা হবে।
প্রতিষ্ঠানটি এএফপিকে জানিয়েছে, নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা প্রথমে যুক্তরাষ্ট্রে চালু করা হবে। পরে পর্যায়ক্রমে বিশ্বব্যাপী কার্যকর করা হবে। তবে অন্যান্য দেশে কবে নাগাদ এটি চালু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সূচি জানানো হয়নি।
এআই বন্ধ করলে গুগল সার্চেও প্রভাব পড়বে?
গুগলের নতুন সিদ্ধান্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সার্চ ইঞ্জিনের সঙ্গে এআই ফিচারের সম্পর্ক। কোনো স্কুল শিক্ষার্থীদের জন্য এআই সুবিধা বন্ধ রাখলে তারা গুগল সার্চও ব্যবহার করতে পারবে না—এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে।
গুগলের শিক্ষা বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট ক্রিস ফিলিপস নিউইয়র্ক টাইমসকে বলেন, সার্চ ও এআই এখন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। কারণ গুগলের সার্চ ইঞ্জিনের ভেতরেই এআই সুবিধা যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি জানান, কোনো স্কুল এআই নিষিদ্ধ করলে শিক্ষার্থীরা সার্চ ব্যবহারের সুযোগও হারাতে পারে। সেক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের সামনে সার্চ সেবা পাওয়া যাচ্ছে না বলে একটি বার্তা দেখানো হবে।
শিক্ষায় এআই ব্যবহার নিয়ে বিতর্ক
স্কুলশিক্ষায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কিছুদিন ধরেই আলোচনা চলছে। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় নিজেরা চিন্তা ও পরিশ্রম করার পরিবর্তে এআইয়ের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে—এমন উদ্বেগ রয়েছে।
নিউইয়র্কের মেয়র জোহরান মামদানি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে গুগলের সিদ্ধান্তের সমালোচনা করেছেন। তার মতে, সরকারি স্কুলগুলোতে এআই ব্যবহারের বিষয়টি কোনো প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের একক সিদ্ধান্তে নির্ধারিত হওয়া উচিত নয়।
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের দুই সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেনথাল ও জোশ হাওলি গুগলসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে পাঠানো এক চিঠিতে এআই ফিচার নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। চিঠিতে বলা হয়, বিশ্বজুড়ে ১৫ কোটিরও বেশি শিক্ষার্থী গুগল ক্লাসরুম ব্যবহার করে। স্কুলের ডিভাইসে এআই ফিচারগুলো কেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে চালু রাখা হয়েছিল, সে বিষয়েও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়।
আগেও শিক্ষার্থীদের জন্য চালু হয়েছিল জেমিনি
এর আগে গত আগস্টে সব বয়সী শিক্ষার্থীর জন্য গুগল ক্লাসরুমে জেমিনি চ্যাটবট ব্যবহারের সুবিধা চালু করেছিল গুগল। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় সহায়তা, স্টাডি গাইড তৈরি, অনুশীলন কুইজ ও ফ্ল্যাশকার্ড ব্যবহারের সুযোগ পায়।
শিক্ষার্থীদের শ্রেণি ও অ্যাসাইনমেন্ট অনুযায়ী প্রাথমিক নির্দেশনাও দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল এতে। যেসব স্কুল আগে থেকেই জেমিনি ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছিল, সেসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের অ্যাকাউন্টে সুবিধাটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সক্রিয় ছিল।
এদিকে গত সেপ্টেম্বরেই নিউইয়র্ক ও লস অ্যাঞ্জেলেসের স্কুল কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের ডিভাইসে এআই ব্যবহারের বিষয়ে সীমাবদ্ধতা আনার পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিল।
লস অ্যাঞ্জেলেস ইউনিফাইড স্কুল ডিস্ট্রিক্টের এক মুখপাত্র জানিয়েছেন, গুগলের নতুন ঘোষণা এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে তারা পর্যালোচনা করছেন। কর্তৃপক্ষের মতে, যথাযথ নিরাপত্তা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা গেলে এআই শিক্ষাদান ও শেখার প্রক্রিয়াকে উন্নত করতে পারে। তবে প্রযুক্তি যেন শিক্ষকদের বিকল্প হয়ে না দাঁড়ায় এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত তথ্যের গোপনীয়তা বজায় থাকে, সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
অন্যদিকে নিউইয়র্ক সিটি পাবলিক স্কুলস ইতোমধ্যে শিক্ষার্থীদের ব্যবহৃত ক্রোমবুক থেকে জেমিনি চ্যাটবট ও এআই মোড বন্ধ রেখেছে। পাশাপাশি গুগল সার্চের এআই ওভারভিউ ফিচার নিষ্ক্রিয় করার অনুরোধও জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
গুগল জানিয়েছে, নতুন নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার মাধ্যমে স্কুলগুলো এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রে আরও বেশি সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি স্বীকার করেছে, শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় শর্টকাট নেওয়ার জন্য এআই ব্যবহার করছে কি না, তা নিয়ে স্কুলগুলোর উদ্বেগ রয়েছে।
সব মিলিয়ে শিক্ষাক্ষেত্রে এআইয়ের ব্যবহার নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। একদিকে পড়াশোনায় প্রযুক্তির সুবিধা, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা ও ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা—এই দুই দিক বিবেচনা করেই এগোতে চাইছে স্কুল কর্তৃপক্ষ।

