আন্তর্জাতিক ডেস্ক

নেপাল-চীন সীমান্তের কাছে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যার পেছনে ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতায় একটি হিমবাহের বড় অংশ ধসে পড়ার ঘটনাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। হিমবাহ থেকে বরফ, পাথর ও বিপুল পরিমাণ ধ্বংসাবশেষ নেমে এসে নদীর গতিপথে ভয়াবহ ঢেউ সৃষ্টি করে। এতে কয়েক মিনিটের মধ্যেই বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়।

স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, হিমবাহের নিচের অংশ ভেঙে প্রায় ১ হাজার ২০০ মিটার নিচে উপত্যকায় আছড়ে পড়ে। পরে সেই বরফ-পাথরের ধস নদীতে বিপুল পরিমাণ পানি ও পলিমাটি যোগ করে আকস্মিক বন্যার সৃষ্টি করে।

নেপালের জাতীয় দুর্যোগ কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুওয়াগাধি ক্রসিং থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার উত্তর-পূর্বে লেন্দে নদীতে এই বিপর্যয়ের সূত্রপাত হয়। বন্যার স্রোতের সঙ্গে বিপুল পাথর ও কাদা ভাটির দিকে ছড়িয়ে পড়ে।

মাত্র ৩০ মিনিটে পানি বাড়ে ৩০ ফুট

আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়নবিষয়ক সংস্থা আইসিমোডের তথ্য অনুযায়ী, আকস্মিক বন্যার পর কোশি ও ত্রিশূলী নদী অববাহিকায় পানি, পলি ও বিশালাকার পাথরের প্রবাহ ভয়াবহ রূপ নেয়। ভাটির দিকে কিছু এলাকায় মাত্র ৩০ মিনিটে নদীর পানির উচ্চতা প্রায় ৯ মিটার বা ৩০ ফুট বেড়ে যায়।

এমন প্রবল স্রোতে বাড়িঘর, সড়ক, সেতু ও বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপালের নুয়াকোট, রাসুওয়া ও আশপাশের এলাকাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।

ভূমিকম্প নয়, ধসের কম্পন?

দুর্যোগের পরপরই নেপালের কর্মকর্তারা সম্ভাব্য ভূমিকম্পকে বন্যার কারণ হিসেবে সন্দেহ করেছিলেন। স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে কম্পন অনুভূত হওয়ার তিন মিনিটের মধ্যেই বন্যা শুরু হওয়ায় বিষয়টি নিয়ে এমন ধারণা তৈরি হয়।

তবে পরে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS)-এর বিশ্লেষণে ভিন্ন চিত্র উঠে আসে। সংস্থাটির মতে, প্রথমে যে ৪ দশমিক ৪ মাত্রার ভূমিকম্পের কথা বলা হয়েছিল, সেটি আসলে হিমবাহ, বরফ ও পাথরের ধস এবং পরবর্তী ধ্বংসাবশেষ প্রবাহ থেকে সৃষ্ট ভূকম্পন হতে পারে। অর্থাৎ, মূল কারণ হিসেবে ভূমিকম্পের পরিবর্তে হিমবাহধসকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

শত শত মানুষ এখনো নিখোঁজ

২৭ আগস্টের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নেপালে বন্যায় অন্তত ১৬২ জনের মৃত্যু নিশ্চিত করেছে পুলিশ। একই সঙ্গে শত শত মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। পর্যটন কর্মকর্তাদের হিসাবে, নেপালের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ৫৭৯ পর্যটক ও ভ্রমণকারীর সঙ্গে এখনো যোগাযোগ করা যায়নি; তাঁদের মধ্যে চার শতাধিক বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।

অন্যদিকে চীনের তিব্বত অংশেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সীমান্তের দুই পাশে নিখোঁজের সংখ্যা মিলিয়ে প্রায় দেড় হাজারে পৌঁছেছে বলে ২৭ আগস্টের রয়টার্স প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। উদ্ধারকারীরা হেলিকপ্টার ও অন্যান্য উপায়ে নিখোঁজদের সন্ধান চালাচ্ছেন।

জলবায়ু পরিবর্তনেও বাড়ছে ঝুঁকি

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি এবং হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার কারণে বরফ ও পাথরের ধস এবং হঠাৎ বন্যার ঝুঁকি বাড়ছে। তবে নেপালের এই নির্দিষ্ট দুর্যোগে জলবায়ু পরিবর্তন কতটা সরাসরি ভূমিকা রেখেছে, তা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।

উদ্ধার অভিযান চললেও সীমান্তের উজানে নদীর গতিপথে এখনো প্রতিবন্ধকতা থাকায় নতুন করে বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোতে উদ্ধারকাজের পাশাপাশি দ্বিতীয় দফার বন্যা মোকাবিলার প্রস্তুতিও জোরদার করা হচ্ছে।

সূত্র: রয়টার্স, এপি, দ্য গার্ডিয়ান

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version