১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত দিন। সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে তৎকালীন সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা ও মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং জাতীয় পরিচয় গঠনে তার ভূমিকা নিয়ে নানা আলোচনা ও মূল্যায়ন তৈরি হয়েছে।
লেখক গাজীউল হাসান খানের মতে, ৭ নভেম্বরের ঘটনাপ্রবাহ জিয়াউর রহমানকে দেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসে। একটি কঠিন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি রাষ্ট্র পরিচালনার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব গ্রহণ করেন এবং পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদভিত্তিক রাজনৈতিক দর্শন প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন।
বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ ও রাজনৈতিক দর্শন
মুক্তিযুদ্ধের পরবর্তী সময়ে জিয়াউর রহমান দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে মনোযোগ দেন। ১৯৭৮ সালে তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) প্রতিষ্ঠা করেন। তার রাজনৈতিক দর্শনের অন্যতম ভিত্তি ছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ।
লেখকের বিশ্লেষণে, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের মূল ধারণা ছিল ভাষা, ধর্ম, বর্ণ ও আঞ্চলিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে স্বাধীন বাংলাদেশের সব নাগরিককে একটি বৃহত্তর জাতীয় পরিচয়ের আওতায় ঐক্যবদ্ধ করা।
তিনি মনে করেন, বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রচলিত ধারণায় দেশের সব সম্প্রদায়ের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় স্বাতন্ত্র্য সমানভাবে প্রতিফলিত হয়নি। সে জায়গা থেকেই জিয়াউর রহমান বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণাকে সামনে নিয়ে আসেন।
এই দর্শনের মাধ্যমে পাহাড় থেকে সমতল পর্যন্ত দেশের সব জনগোষ্ঠীকে জাতীয় ঐক্য ও উন্নয়নের ধারায় যুক্ত করার লক্ষ্য ছিল বলে লেখক উল্লেখ করেন।
কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে জিয়ার উদ্যোগ
জিয়াউর রহমানের শাসনামলের উল্লেখযোগ্য কর্মসূচিগুলোর মধ্যে ছিল দেশব্যাপী খাল খনন, কৃষি উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মৎস্য চাষ সম্প্রসারণ।
লেখকের মতে, কৃষি খাতে উৎপাদন বাড়াতে সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং পানির প্রাপ্যতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে খাল খনন কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। এ উদ্যোগ কৃষক ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল।
এ ছাড়া গ্রামসরকার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের মাধ্যমে স্থানীয় পর্যায়ে প্রশাসন ও উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও কার্যকর করার চেষ্টা করা হয়।
লেখক মনে করেন, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, শিল্প ও বাণিজ্যসহ বিভিন্ন খাতে জিয়াউর রহমানের নেওয়া কর্মসূচিগুলো বাংলাদেশের উন্নয়ন ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে।
আঞ্চলিক সহযোগিতা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা
দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রেও জিয়াউর রহমানের উদ্যোগের কথা তুলে ধরেছেন লেখক।
তার মতে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সুসম্পর্ক, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা ছাড়া একটি উন্নয়নশীল দেশের অগ্রগতি সম্ভব নয়।
এ চিন্তা থেকেই দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) গঠনের ধারণা সামনে আসে। পরবর্তী সময়ে ১৯৮৫ সালে সার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়।
লেখকের দৃষ্টিতে, আঞ্চলিক সহযোগিতার এই উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক ও উন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি তৈরি করেছিল।
গণতন্ত্র ও রাজনৈতিক উত্তরাধিকার
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক জীবনের মূল্যায়নে গণতন্ত্র ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়টিও উঠে এসেছে লেখকের আলোচনায়। তার মতে, সামরিক পটভূমি থেকে উঠে এলেও জিয়াউর রহমান পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক দল গঠন, নির্বাচন আয়োজন এবং বেসামরিক রাজনৈতিক কাঠামো প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
১৯৮১ সালের ৩০ মে চট্টগ্রামে এক সামরিক অভ্যুত্থানে জিয়াউর রহমান নিহত হন। তার মৃত্যুর পরও বিএনপির রাজনৈতিক উত্তরাধিকার দেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে।
পরবর্তী সময়ে তার স্ত্রী খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় আসে। ১৯৯১ সালের ৬ আগস্ট দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে দেশে সংসদীয় সরকারব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়।
৭ নভেম্বরের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের ঘটনাকে জিয়াউর রহমানের জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে উল্লেখ করেছেন লেখক। এ প্রসঙ্গে তিনি কর্নেল (অব.) এম এ হামিদের লেখা থেকে উদ্ধৃতি দিয়েছেন।
এম এ হামিদের বর্ণনা অনুযায়ী, ওই দিন সেনাবাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটের সৈনিকদের মধ্যে স্লোগান ও মিছিলের মাধ্যমে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল, তা একপর্যায়ে সিপাহি-জনতার অভ্যুত্থানের রূপ নেয়।
সেদিনের ঘটনাপ্রবাহে জিয়াউর রহমান মুক্ত হওয়ার পর দেশের সামরিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে আসেন। পরবর্তী সময়ে তার রাজনৈতিক উত্থান বাংলাদেশের ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করে।
লেখক গাজীউল হাসান খানের মূল্যায়নে, জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দর্শন, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচি, আঞ্চলিক সহযোগিতার উদ্যোগ এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ধারণা তাকে দেশের ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।
লেখক: গাজীউল হাসান খান। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক এবং বীর মুক্তিযোদ্ধা।

