২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে—এমন একটি দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবারও আলোচনায় এসেছে। এর পেছনে রয়েছে ১৯৬০ সালে বিজ্ঞান সাময়িকী Science-এ প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্র। তবে গবেষণাপত্রটি আসলে পৃথিবী ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী করেনি; তৎকালীন জনসংখ্যা বৃদ্ধির ধারা একইভাবে চলতে থাকলে বিশ্বের জনসংখ্যা একটি গাণিতিক ‘সিঙ্গুলারিটি’র দিকে যাবে—এমন মডেল উপস্থাপন করেছিল।
কোথা থেকে এলো ১৩ নভেম্বরের তারিখ?
১৯৬০ সালে হাইঞ্জ ফন ফোরস্টার, প্যাট্রিসিয়া এম. মোরা ও লরেন্স ডব্লিউ. আমিয়ট ‘Doomsday: Friday, 13 November, A.D. 2026’ শিরোনামে গবেষণাটি প্রকাশ করেন। এতে খ্রিষ্টীয় প্রথম শতাব্দী থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত বৈশ্বিক জনসংখ্যার তথ্য বিশ্লেষণ করে একটি গাণিতিক মডেল তৈরি করা হয়। ওই মডেল অনুযায়ী, জনসংখ্যা বৃদ্ধির একই ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর সংখ্যাটি অসীমের দিকে চলে যেত।
অর্থাৎ গবেষণাটির ‘ডুমসডে’ শিরোনামটি ছিল জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি চরম গাণিতিক ফলাফলকে বোঝাতে। এটি পৃথিবী বিস্ফোরিত হওয়া, গ্রহ ধ্বংস হওয়া বা ১৩ নভেম্বর কোনো মহাজাগতিক বিপর্যয় ঘটার বৈজ্ঞানিক পূর্বাভাস ছিল না।
কেন সেই পূর্বাভাস বাস্তবে মিলছে না?
গবেষণাটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সীমাবদ্ধতা ছিল—জনসংখ্যা বৃদ্ধির পুরোনো প্রবণতাকে দীর্ঘ সময় ভবিষ্যতের জন্য একইভাবে চালিয়ে নেওয়া। কিন্তু বাস্তবে বিশ্বজুড়ে জন্মহার ধীরে ধীরে কমেছে।
জাতিসংঘের World Population Prospects 2024 অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে প্রতি নারী গড়ে প্রায় ২ দশমিক ২৫টি সন্তান জন্ম দেন। ১৯৯০ সালে এই হার ছিল ৩ দশমিক ৩১। জাতিসংঘের হিসাবে, বিশ্ব জনসংখ্যা ২০২৪ সালের প্রায় ৮ দশমিক ২ বিলিয়ন থেকে বাড়তে বাড়তে ২০৫০ সালে প্রায় ৯ দশমিক ৭ বিলিয়নে এবং ২০৮০-এর দশকের মাঝামাঝি প্রায় ১০ দশমিক ৩ বিলিয়নে পৌঁছাতে পারে। এরপর তা ধীরে ধীরে স্থিতিশীল বা কমতে পারে।
জাতিসংঘের এই পূর্বাভাস ২০২৬ সালের কোনো এক দিনে পৃথিবীর জনসংখ্যা অসীম হয়ে যাওয়ার ধারণার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। বরং বর্তমান জনমিতিক তথ্য বিশ্ব জনসংখ্যা বৃদ্ধির গতি কমে আসার দিকেই ইঙ্গিত করছে।
১৯৯০-এর দশকেই দুর্বল হয়ে পড়ে পুরোনো মডেল
পুরোনো গবেষণার আলোচনায় দেখা যায়, কয়েক দশক পর্যন্ত এর গাণিতিক প্রবণতা বাস্তব জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে কিছুটা সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। কিন্তু ১৯৯৩ সালের পর জনসংখ্যা বৃদ্ধির বাস্তব হার ওই মডেলের পূর্বাভাস থেকে পিছিয়ে যেতে শুরু করে। ফলে ২০২৬ সালের জন্য নির্ধারিত ‘সিঙ্গুলারিটি’ আর বাস্তব জনমিতিক প্রবণতার সঙ্গে মেলে না।
এর অন্যতম কারণ বিশ্বজুড়ে জন্মহারে দীর্ঘমেয়াদি পতন। কম সন্তান নেওয়ার প্রবণতা, নারীদের শিক্ষা ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, নগরায়ণ, স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি এবং পরিবার পরিকল্পনার বিস্তার—বিভিন্ন সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তন জনসংখ্যার গতিপথ বদলে দিয়েছে।
তাহলে ১৩ নভেম্বর কী হবে?
বৈজ্ঞানিকভাবে এমন কোনো প্রমাণ নেই যে ১৩ নভেম্বর ২০২৬ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। ১৯৬০ সালের গবেষণার গাণিতিক পূর্বাভাসকে বর্তমান বৈশ্বিক জনসংখ্যার বাস্তবতার সঙ্গে মিলিয়ে দেখলে বরং বোঝা যায়, সেই মডেলের প্রাথমিক অনুমান আর কার্যকর নেই।
জাতিসংঘের বর্তমান জনসংখ্যা মডেলও পৃথিবী ধ্বংসের কোনো সম্ভাবনা দেখায় না। বরং বর্তমান প্রবণতা অনুযায়ী এই শতাব্দীর মধ্যেই অনেক দেশের জনসংখ্যা কমতে শুরু করবে এবং বৈশ্বিক জনসংখ্যাও শতাব্দীর শেষভাগে সর্বোচ্চ পর্যায় থেকে কিছুটা কমে আসতে পারে।
গুজবের সঙ্গে বিজ্ঞানের পার্থক্য
‘২০২৬ সালের ১৩ নভেম্বর পৃথিবী ধ্বংস হবে’—এই বক্তব্যটি মূল গবেষণার বক্তব্যকে অতিরঞ্জিতভাবে উপস্থাপন করে। গবেষণাপত্রে মূলত জনসংখ্যা বৃদ্ধির একটি নির্দিষ্ট গাণিতিক মডেল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল; সেটিকে পৃথিবী ধ্বংসের নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে নেওয়া বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়।
তাই ১৩ নভেম্বরকে ঘিরে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক কারণ নেই। বরং এই ঘটনা দেখায়, দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে গাণিতিক মডেলের পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে মানুষের আচরণ ও সামাজিক পরিবর্তনও বিবেচনায় নেওয়া কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

