ইয়েমেনে আবারও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইরান-সমর্থিত হুথিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা অঞ্চল পুনর্দখলে সর্বাত্মক সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দিয়েছে দেশটির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার। এই ঘোষণার পর থেকেই মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে।
ইয়েমেনের প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিলের (পিএলসি) চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি জানিয়েছেন, হুথিদের নিয়ন্ত্রণ থেকে দেশের ভূখণ্ড মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত সরকারি বাহিনীর অভিযান অব্যাহত থাকবে। এরই মধ্যে হুথিরাও পাল্টা হামলার দাবি করেছে।
ইয়েমেনে কেন আবার বড় যুদ্ধের আশঙ্কা?
ইয়েমেনে ২০১৪ সাল থেকে হুথি আন্দোলন দেশটির রাজধানী সানা ও উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা এই সংঘাতের সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোও জড়িয়ে আছে।
হুথিদের পেছনে ইরানের সমর্থন রয়েছে বলে অভিযোগ করে সৌদি আরব ও তাদের মিত্ররা। অন্যদিকে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার সৌদি আরবের সমর্থন পেয়ে আসছে। ফলে ইয়েমেনের গৃহযুদ্ধ অনেক আগেই একটি আঞ্চলিক সংঘাতে পরিণত হয়েছে।
এখন সরকারি বাহিনী নতুন করে বড় অভিযান শুরু করলে সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বাব আল-মান্দাব প্রণালি কেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইয়েমেনের সংঘাত শুধু দেশটির অভ্যন্তরীণ বিষয় নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি নিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বাব আল-মান্দাব প্রণালি লোহিত সাগরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত একটি গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। এ পথ দিয়ে ইউরোপ, এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের মধ্যে বিপুল পরিমাণ পণ্য ও জ্বালানি পরিবহন করা হয়।
হুথিদের এই এলাকার নিয়ন্ত্রণ বা সেখানে নৌযান চলাচলে হুমকি তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালি ঘিরে যখন আগে থেকেই উত্তেজনা রয়েছে, তখন বাব আল-মান্দাবেও অস্থিরতা তৈরি হলে বিশ্ববাজারে তার প্রভাব পড়তে পারে।
সৌদি আরবেও হামলার দাবি
ইয়েমেন সরকার সামরিক অভিযান শুরুর ঘোষণা দেওয়ার পর হুথিরা সৌদি আরবে পাল্টা হামলার দাবি করেছে। তাদের বক্তব্য, রিয়াদ ও খুরাইস এলাকায় সৌদি আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করা হয়েছে।
হুথিরা আরও দাবি করেছে, ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন বাহিনীর একাধিক হামলার জবাব হিসেবেই তারা এসব হামলা চালিয়েছে।
তবে হুথিদের করা এসব দাবির সবকিছু স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি। এ ধরনের পরিস্থিতিতে সংঘাতরত পক্ষগুলোর বক্তব্যকে সতর্কতার সঙ্গে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
সৌদি আরবের ভূমিকা কী?
ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের অন্যতম প্রধান সমর্থক সৌদি আরব। নতুন সামরিক অভিযানে সৌদি আরবের বিমান সহায়তা এবং ইয়েমেনি সরকারি বাহিনীর স্থল অভিযান—এমন একটি সমন্বিত কাঠামোর কথা সামনে এসেছে।
এর ফলে সংঘাতটি শুধু ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী বনাম হুথিদের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে আরও বড় আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা কয়েকটি দেশের ভূমিকা নিয়েও আলোচনা হচ্ছে। বিশেষ করে গোয়েন্দা সহায়তা ও প্রতিরক্ষামূলক সহযোগিতার বিষয়টি সামনে এসেছে।
তায়েজ কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ইয়েমেনের তায়েজ অঞ্চলও নতুন সংঘাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠছে। দেশটির অন্যতম বড় শহর তায়েজের আশপাশে কৌশলগত অবস্থান নিয়ন্ত্রণ করতে পারলে যোগাযোগব্যবস্থা ও সরবরাহপথে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
বিশেষ করে তায়েজ-আদেন সড়কের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা হলে তায়েজ শহরের পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে। ফলে সামরিক দৃষ্টিকোণ থেকে অঞ্চলটি উভয় পক্ষের কাছেই গুরুত্বপূর্ণ।
সাধারণ মানুষের জন্য কী পরিণতি হতে পারে?
ইয়েমেন বহু বছর ধরে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ, খাদ্যসংকট, বাস্তুচ্যুতি ও অর্থনৈতিক দুরবস্থায় লাখো মানুষ ইতোমধ্যেই বিপর্যস্ত।
নতুন করে বড় সামরিক অভিযান শুরু হলে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়বেন বেসামরিক মানুষ। যুদ্ধ তীব্র হলে খাদ্য ও চিকিৎসা সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি নতুন করে বিপুলসংখ্যক মানুষ বাস্তুচ্যুত হতে পারেন।
এ ছাড়া বিদ্যুৎ, পানি, সড়ক ও স্বাস্থ্যসেবার মতো মৌলিক অবকাঠামোর ওপরও চাপ বাড়তে পারে।
বিশ্ববাজারে কী প্রভাব পড়তে পারে?
ইয়েমেনের সংঘাত যদি বাব আল-মান্দাব ও লোহিত সাগরের নৌপথে প্রভাব ফেলে, তাহলে এর অর্থনৈতিক প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে যেতে পারে।
জাহাজ চলাচলে ঝুঁকি বাড়লে পরিবহন খরচ, বিমা ব্যয় ও পণ্য পরিবহনের সময় বেড়ে যেতে পারে। তেলের মতো গুরুত্বপূর্ণ পণ্যের সরবরাহপথে অনিশ্চয়তা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে দামও বাড়তে পারে।
অর্থাৎ ইয়েমেনে একটি সামরিক সংঘাত শুরু হলেও এর প্রভাব পড়তে পারে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও এশিয়ার বাজারে।
সামনে কী হতে পারে?
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ইয়েমেন সরকার ও তাদের মিত্ররা হুথিদের কতটা পিছু হটাতে পারবে এবং হুথিরা কীভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।
সরকারি বাহিনী যদি বড় ধরনের স্থল অভিযান চালায় এবং সৌদি আরব ও অন্যান্য মিত্ররা সক্রিয়ভাবে সহায়তা করে, তাহলে যুদ্ধ আরও দীর্ঘ ও তীব্র হতে পারে। অন্যদিকে হুথিরা যদি সৌদি আরব বা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথে হামলা বাড়ায়, তাহলে আঞ্চলিক সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার ঝুঁকি থাকবে।
সব মিলিয়ে, ইয়েমেনের নতুন সামরিক অভিযান এখন শুধু একটি দেশের গৃহযুদ্ধের বিষয় নয়। বাব আল-মান্দাব, লোহিত সাগর, সৌদি আরব ও ইরানের মতো গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে এটি সরাসরি যুক্ত। তাই আগামী দিনগুলোতে ইয়েমেনের পরিস্থিতির দিকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের নজর আরও বাড়বে।

