মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়নে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিতে যাচ্ছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন। জব্দ করা সম্পত্তি বিক্রি করে পাওয়া অর্থ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের মধ্যে বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার পক্ষে নির্ধারিত ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করা হয়নি। ফলে সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়নে আইনগত কোনো বাধা দেখছে না প্রসিকিউশন।
আপিলের বিষয়ে প্রধান প্রসিকিউটর বলেন, একজনের আপিলের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তির অংশের আপিল কার্যকর হয় না। শেখ হাসিনার পক্ষে কোনো আপিল করা হয়নি।
ওবায়দুল কাদেরসহ ১১-১২ জনের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের আওতায়
শুধু শেখ হাসিনা নন, আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরসহ আরও কয়েকজনের সম্পত্তিও বাজেয়াপ্তের আদেশের আওতায় রয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান প্রসিকিউটর।
তিনি বলেন, যাচাই-বাছাই করে এ ধরনের আদেশের আওতায় থাকা প্রায় ১১ থেকে ১২ জনের সম্পত্তি শনাক্ত করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের এসব সম্পত্তি দ্রুত সরকারি হেফাজতে নেওয়া হবে।
তবে সম্পত্তিগুলো বিক্রি করে মোট কত টাকা পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়ে এখনো কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। সম্পত্তির অবস্থান শনাক্ত এবং মূল্যায়ন সম্পন্ন হওয়ার পর এ বিষয়ে ধারণা পাওয়া যাবে।
প্রধান প্রসিকিউটরের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাইব্যুনালের রায়ে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বিক্রি করে সেই অর্থ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের মধ্যে বিতরণের বিষয়টি রয়েছে।
৩০ দিন পার হলে আপিলের সুযোগ নেই: প্রসিকিউশন
প্রধান প্রসিকিউটর আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ২১ ধারার কথা উল্লেখ করেন। এ ধারার ১ ও ২ উপধারা অনুযায়ী, দণ্ডিত ব্যক্তি এবং সরকার বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের আপিল করার সুযোগ রয়েছে। তবে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করতে হয়। নির্ধারিত সময় পার হলে ওই ধারায় আর আপিল করা যায় না।
দেরিতে আপিল করার সুযোগ বা সময়সীমা মওকুফের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আমিনুল ইসলাম বলেন, প্রসিকিউশনের অবস্থান হলো, বিশেষ আইনের ক্ষেত্রে তামাদি আইন প্রযোজ্য নয়।
তিনি আরও বলেন, ৩০ দিন পার হয়ে গেলে রায়ের বাকি অংশ বাস্তবায়নে আইনগত বাধা থাকে না। তবে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তি গ্রেপ্তার হলে তাঁর সাজা কার্যকর করা হবে।
এ বিষয়ে আপিল বিভাগের কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি বলেও জানান তিনি। কোনো আপিল বিচারাধীন থাকলে নির্ধারিত সময়সীমা অতিক্রমের বিষয়টি আদালতে তুলে ধরবে প্রসিকিউশন।
সম্পত্তি বিক্রির অর্থ পাবে জুলাই শহীদদের পরিবার
প্রধান প্রসিকিউটর জানান, ট্রাইব্যুনালের আদেশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের। এ ক্ষেত্রে সরকারি পাওনা আদায় আইন বা ফৌজদারি কার্যবিধির ৩৮৬ ধারার অধীনে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। তবে সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত ও বিক্রির জন্য আলাদা বিধিমালা থাকলে প্রক্রিয়াটি আরও সহজ হবে বলে মনে করেন তিনি।
শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের মামলার রায়ে সম্পত্তির ৫০ শতাংশ বাজেয়াপ্তের বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকার বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে আমিনুল ইসলাম রোম সংবিধির প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, রোম সংবিধিতে সর্বোচ্চ ৭৫ শতাংশ পর্যন্ত সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিধান রয়েছে।
তিনি জানান, আগের রায়গুলোতে বিষয়টি স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও আইন অনুযায়ী বাজেয়াপ্তের আদেশ বাস্তবায়নের বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে পরামর্শ দেবে প্রসিকিউশন।
সবকিছু মিলিয়ে শেখ হাসিনা, ওবায়দুল কাদেরসহ আদেশের আওতায় থাকা অন্যদের সম্পত্তি সরকারি হেফাজতে নেওয়া এবং বিক্রির প্রক্রিয়া শুরুর প্রস্তুতি চলছে। এ থেকে পাওয়া অর্থ জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে নিহতদের পরিবারের কাছে পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে সরকারের।

