বাংলাদেশে শারদীয় দুর্গাপূজার বড় আয়োজন এবং ভারতের পশ্চিমবঙ্গে ঈদুল আজহার নামাজের স্থান পরিবর্তন—দুই বাংলার ধর্মীয় উৎসব ঘিরে এ বছর ভিন্ন ধরনের আলোচনা তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশে দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি, সরকারি ছুটি ও নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, পশ্চিমবঙ্গে ঐতিহ্যবাহী রেড রোডের পরিবর্তে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ঈদের জামাত আয়োজনের সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
তবে দুই অঞ্চলের পরিস্থিতি তুলনা করতে হলে উৎসবের আয়োজন, সরকারি সিদ্ধান্ত, নিরাপত্তা এবং সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। কোনো একটি ঘটনা দিয়ে সামগ্রিক পরিস্থিতির চূড়ান্ত মূল্যায়ন করা যায় না।
বাংলাদেশে দুর্গাপূজায় ৩৩ হাজার ৮৫১ মণ্ডপ
বাংলাদেশে ২০২৬ সালের শারদীয় দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়েছে দেশজুড়ে ৩৩ হাজার ৮৫১টি মণ্ডপে। গত বছর এই সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ৩৫১টি। অর্থাৎ, এক বছরে মণ্ডপের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় দেড় হাজার।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, দুর্গাপূজার জন্য বরাদ্দ চার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ কোটি টাকা করা হয়। পাশাপাশি দুর্গাপূজার সরকারি ছুটি বাড়িয়ে তিন দিন করা হয়েছিল। সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় অনেকের জন্য টানা পাঁচ দিনের অবকাশ তৈরি হয়।
পূজার নিরাপত্তায় প্রশাসনিক প্রস্তুতি
দুর্গাপূজা উপলক্ষে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা জোরদার করার কথা জানিয়েছিল সরকার। পূজামণ্ডপ পর্যবেক্ষণ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশেষ প্রস্তুতির কথাও জানানো হয়েছিল।
দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মণ্ডপের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ছুটি সম্প্রসারণ সনাতন ধর্মাবলম্বীদের উৎসব উদ্যাপনের সুযোগ বাড়িয়েছে। তবে পুরো দেশের প্রতিটি স্থানের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য ছাড়া একে নিঃশর্তভাবে ইতিহাসের সেরা বা সম্পূর্ণ ঘটনামুক্ত পূজা হিসেবে অভিহিত করা সমীচীন নয়।
পশ্চিমবঙ্গে রেড রোডের বদলে ব্রিগেডে ঈদের জামাত
২০২৬ সালের মে মাসে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি সরকার গঠনের পর ঈদুল আজহার জামাতের স্থান পরিবর্তন নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বাধীন সরকার জনসড়কে নামাজ আদায়ের ওপর নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে কলকাতার ঐতিহ্যবাহী রেড রোডের পরিবর্তে ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে ঈদের বড় জামাত অনুষ্ঠিত হয়।
সরকারের পক্ষ থেকে যান চলাচল ও জনসাধারণের চলাচলে বিঘ্ন এড়ানোর যুক্তি দেওয়া হয়েছিল। তবে দীর্ঘদিনের প্রচলিত স্থান পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক মহলে প্রশ্ন ওঠে।
ঈদের নামাজ বাতিল করা হয়নি; বরং অন্য স্থানে আয়োজন করা হয়েছিল। তবু ঐতিহ্যবাহী রেড রোডে জামাত বন্ধের সিদ্ধান্তকে অনেকে ধর্মীয় সমাবেশের ক্ষেত্রে সরকারি নীতির ধারাবাহিকতা ও সমতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণ হিসেবে দেখেছেন।
রেড রোড ব্যবহারের নীতিতে বৈষম্যের অভিযোগ
ঈদের জামাতের জন্য রেড রোড ব্যবহার করতে না দেওয়ার সিদ্ধান্তের পর একই সড়ক অন্যান্য বড় আয়োজনের জন্য ব্যবহারের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। জুন মাসে আন্তর্জাতিক যোগ দিবসের প্রস্তুতি ও আয়োজনের জন্য রেড রোড কয়েক দিন বন্ধ রাখার ঘটনায় সমালোচকেরা সরকারি সিদ্ধান্তের সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
এ বিতর্কের মূল বিষয় হলো, জনসড়ক ব্যবহারের বিধিনিষেধ সব ধরনের ধর্মীয় ও সামাজিক আয়োজনের ক্ষেত্রে একইভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে কি না। এ বিষয়ে সরকারের যুক্তি, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং সমালোচকদের বক্তব্য আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।
কোরবানির পশু জবাইয়ের বিধিনিষেধ নিয়েও বিতর্ক
পশ্চিমবঙ্গে ঈদুল আজহার সময় গবাদিপশু বিক্রি ও জবাইসংক্রান্ত বিধিনিষেধ নিয়েও আলোচনা হয়েছিল। রাজ্য সরকার পশ্চিমবঙ্গ প্রাণী জবাই নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৫০-এর বিধান কঠোরভাবে কার্যকর করার উদ্যোগ নেয়। বিষয়টি নিয়ে কলকাতা হাইকোর্টও সরকারের অবস্থান ও ঈদ উপলক্ষে ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করতে বলেছিল।
এ পরিস্থিতিতে কয়েকজন মুসলিম ধর্মীয় নেতাও কোরবানির জন্য গরু ব্যবহার না করার পরামর্শ দেন। তবে এসব বিধিনিষেধকে ঈদুল আজহার সব আয়োজন বা কোরবানির সব ধরনের পশু জবাই সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ হওয়ার সমতুল্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না।
কলকাতায় দুর্গাপূজার প্যান্ডেলে পদদলিত হয়ে ১৯ জনের মৃত্যু
পশ্চিমবঙ্গে এ বছরের দুর্গাপূজার সময় কলকাতার চোরবাগান সার্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপে পদদলিত হওয়ার ঘটনায় ১৯ জনের মৃত্যু হয় এবং আরও অনেকে আহত হন। ১৭ অক্টোবরের ওই ঘটনার পর ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তাব্যবস্থায় সম্ভাব্য ত্রুটি তদন্তের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তারের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
এটি ছিল একটি নির্দিষ্ট পূজামণ্ডপে ঘটে যাওয়া মর্মান্তিক দুর্ঘটনা। এর কারণ অনুসন্ধান ও দায় নির্ধারণের জন্য তদন্ত প্রয়োজন। একইভাবে, একটি দুর্ঘটনাকে ভিত্তি করে পশ্চিমবঙ্গের সব পূজার আয়োজনকে অনিরাপদ হিসেবে চিহ্নিত করাও যুক্তিসংগত নয়।
দুই বাংলার উৎসব থেকে কী বোঝা যায়?
বাংলাদেশে দুর্গাপূজার মণ্ডপের সংখ্যা, সরকারি ছুটি ও বরাদ্দের বৃদ্ধি একদিকে যেমন উৎসব আয়োজনের পরিসর তুলে ধরে, তেমনি পশ্চিমবঙ্গে ঈদের জামাতের স্থান পরিবর্তন সরকারি নীতির প্রয়োগ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক তৈরি করেছে।
ধর্মীয় উৎসবের পরিবেশ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু রাজনৈতিক বক্তব্য বা প্রচারমূলক শিরোনামের ওপর নির্ভর না করে বাস্তব তথ্য, সরকারি সিদ্ধান্ত, সংশ্লিষ্ট সম্প্রদায়ের অভিজ্ঞতা এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রতিবেদন বিবেচনা করা প্রয়োজন।
দুই বাংলার মানুষের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আলাদা হলেও উৎসব পালনের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা এবং সমান নাগরিক অধিকারের প্রশ্ন উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। ধর্মীয় সম্প্রীতি বজায় রাখতে স্বচ্ছ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, আইনের সমান প্রয়োগ এবং সব সম্প্রদায়ের প্রতি সম্মান নিশ্চিত করা জরুরি।

