চট্টগ্রামের রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির দুর্গম পাহাড়ি ও বনাঞ্চলকে সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে চিহ্নিত করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এসব এলাকায় সংঘটিত হত্যাকাণ্ড ও গুলির ঘটনায় জড়িত অস্ত্রধারীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চারটি আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন) ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব দিয়েছে চট্টগ্রাম রেঞ্জ পুলিশ।
পুলিশের প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রতিটি ক্যাম্পে একটি প্লাটুনসহ ৫৫ জন করে সদস্য মোতায়েন করা হবে। এ হিসাবে চারটি ক্যাম্পে মোট ২২০ জন সদস্য প্রয়োজন হবে। পাশাপাশি সন্ত্রাসীদের চলাচলের পথ নজরদারিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ক্যামেরা এবং দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় থার্মাল ড্রোন ব্যবহারের প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছে।
গত মাসে চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি স্বাক্ষরিত একটি চিঠিতে এসব প্রস্তাব পুলিশ সদর দপ্তরে পাঠানো হয়। চিঠিতে বলা হয়, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির বিস্তীর্ণ পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় নিয়মিত টহল ও অভিযান পরিচালনায় পুলিশের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এসব এলাকা অস্ত্র, মাদক, বন্যপ্রাণীসহ বিভিন্ন অবৈধ পণ্য পরিবহনের পথ হিসেবেও ব্যবহৃত হচ্ছে বলে পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে।
কোথায় হবে চার ক্যাম্প
পুলিশের পরিকল্পনা অনুযায়ী, একটি ক্যাম্প স্থাপন করা হবে রাউজানে। রাঙ্গুনিয়ার রাজানগর ও পদুয়া এলাকায় দুটি এবং ফটিকছড়িতে আরেকটি ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এপিবিএন প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি হাসিব আজিজ জানিয়েছেন, রাউজানসহ তিন উপজেলায় চারটি ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব তারা পেয়েছেন। রাউজান ও রাঙ্গুনিয়াকে সন্ত্রাসপ্রবণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে দ্রুত ক্যাম্প স্থাপন প্রয়োজন হলেও এপিবিএনে বর্তমানে জনবলসংকট রয়েছে। নতুন ব্যাটালিয়ন গঠন করা গেলে ক্যাম্প স্থাপনের কাজ দ্রুত এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
হত্যাকাণ্ডের পর পাহাড়ে আশ্রয়
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাউজানে ২৫টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এর মধ্যে ১৮টি হত্যাকাণ্ড রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে হয়েছে বলে পুলিশের দাবি। একই সময়ে শতাধিক সংঘর্ষ ও গোলাগুলির ঘটনায় ৩৫০ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
চলতি বছরের ১৩ জুন রাউজানের পাহাড়তলী ইউনিয়নের চৌমুহনী বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয় রাঙ্গুনিয়া উপজেলা যুবদলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক মসুদুল হক চৌধুরীকে। এ ঘটনায় ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে।
এর আগে ২২ এপ্রিল রাউজানের গাজীপাড়া বাজারে প্রকাশ্যে গুলি করে যুবদলকর্মী মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে হত্যা করা হয়। তার দুই দিন আগে ২০ এপ্রিল বাগোয়ান ইউনিয়নের গরিব উল্লাহপাড়া এলাকায় বাড়িতে বসে খাবার খাওয়ার সময় গুলিতে নিহত হন যুবদলকর্মী মোহাম্মদ মানিক আবদুল্লাহ।
একাধিক হত্যাকাণ্ডের পর রাউজানে ১০টি চেকপোস্ট বসিয়ে টহল জোরদার করেছিল পুলিশ। এতে অস্ত্র উদ্ধার ও হত্যাকাণ্ড কিছুটা কমেছে বলে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। তবে দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় স্থায়ী ক্যাম্প ও টহল দল না থাকায় পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা কঠিন বলে মনে করছে পুলিশ।
এআই ক্যামেরা ও থার্মাল ড্রোন
সন্ত্রাসীদের গতিবিধি শনাক্ত করতে উপজেলাগুলোর প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে এবং তাদের চলাচলের গুরুত্বপূর্ণ রুটে এআই ক্যামেরা বসানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পুলিশের শনাক্ত করা সন্ত্রাসীদের ছবি ও তথ্যও এসব ক্যামেরার নজরদারি ব্যবস্থায় যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে।
এ ছাড়া দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় থার্মাল ড্রোন ব্যবহার করে অস্ত্রধারীদের অবস্থান শনাক্ত ও তাদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি ও নজরদারি বাড়ানোর কথাও বলা হয়েছে।
চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক বলেন, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া ও ফটিকছড়ির পাহাড়ি ও বনাঞ্চলকে সন্ত্রাসীরা নিরাপদ আশ্রয় হিসেবে ব্যবহার করছে। তাদের কাছে ভারী অস্ত্র থাকার তথ্যও রয়েছে। এ কারণে দুর্গম এলাকায় ভারী অস্ত্রসহ এপিবিএনের চারটি ক্যাম্প স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, অপরাধীরা প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াচ্ছে। তাদের মোকাবিলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকেও প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, শুধু ক্যাম্প স্থাপন করলেই হবে না; সন্ত্রাসীদের চলাচলের রুটে নিয়মিত তল্লাশি ও অভিযানও জোরদার করতে হবে। এতে অপরাধ সংঘটনের পর দুর্গম এলাকায় পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ কমবে।

