বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবার সরাসরি ভোটের মুখোমুখি হচ্ছেন দুই প্রার্থী। ক্ষমতাসীন বিএনপির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় ঐক্যের প্রার্থী কর্নেল (অব.) অলি আহমদের মধ্যে আগামী বৃহস্পতিবার, ২০ আগস্ট ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
নির্ধারিত সময়ে দুই প্রার্থীর কেউই মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার না করায় নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী ভোটগ্রহণের পথ নিশ্চিত হয়েছে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর দেশের রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন হতে যাচ্ছে।
৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে ভোট
বাংলাদেশে সর্বশেষ প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ১৯৯১ সালে। এরপর বিভিন্ন সময়ে সাতজন রাষ্ট্রপতি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের একক প্রার্থীর বিপরীতে বিরোধী দলগুলো সাধারণত কোনো প্রার্থী দেয়নি।
এবার দুই প্রার্থী থাকায় দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের সরাসরি ভোট দিতে হবে।
কখন ও কোথায় ভোট হবে?
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আগামী ২০ আগস্ট বেলা ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত জাতীয় সংসদ ভবনের সংসদ কক্ষে ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে।
ভোট শুরুর আগে নির্বাচনী কর্তা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিন সংসদ সদস্যদের ভোট দেওয়ার পদ্ধতি সম্পর্কে নির্দেশনা দেবেন।
ভোটগ্রহণ শেষে সংসদ কক্ষেই ব্যালট গণনা করা হবে। এরপর নির্বাচনী কর্তা ফলাফল ঘোষণা করবেন এবং পরবর্তীতে তা গেজেট আকারে প্রকাশ করা হবে।
এবার মোট ভোটার ৩৪৯ জন
জাতীয় সংসদে সংরক্ষিত নারী সদস্যসহ মোট আসনসংখ্যা ৩৫০। তবে বিএনপির আসলাম চৌধুরীর সংসদ সদস্যপদ আদালতের সিদ্ধান্তে বাতিল হওয়ায় এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে মোট ভোটার সংখ্যা ৩৪৯ জন সংসদ সদস্য।
সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি জনগণের সরাসরি ভোটে নির্বাচিত হন না। সংসদ সদস্যরাই রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট দিয়ে থাকেন।
ব্যালটে কীভাবে ভোট দেবেন সংসদ সদস্যরা?
ইসি সচিব জানিয়েছেন, রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ব্যালট পেপারে দুটি অংশ থাকবে। একটি অংশ থাকবে মুড়ি হিসেবে এবং অন্য অংশ হবে মূল ব্যালট।
মুড়ি অংশে ভোটারের ক্রমিক নম্বর, সংসদ সদস্যের নাম ও বিভক্তি নম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য থাকবে। সংসদ সদস্য পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ব্যালট গ্রহণ করবেন।
মূল ব্যালট অংশে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের নাম বাংলা বর্ণমালার আদ্যক্ষর অনুযায়ী সাজানো থাকবে। প্রার্থীর নামের পাশে নির্ধারিত জায়গায় সংসদ সদস্য পূর্ণ নাম স্বাক্ষর করে ভোট প্রদান করবেন।
ভোট দেওয়ার পর ব্যালট নির্ধারিত বাক্সে জমা দিতে হবে। বিকেল ৫টা পর্যন্ত ভোট গ্রহণ চলবে।
ইসি জানিয়েছে, ব্যালট পেপারের রং হবে সাদার ওপর কালো প্রিন্ট।
বিএনপির প্রার্থীর জয় কেন এগিয়ে?
বর্তমান সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে দলটির মনোনীত প্রার্থী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর সংখ্যাগরিষ্ঠ সংসদ সদস্যের সমর্থন পাওয়ার ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছেন।
অন্যদিকে জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোটের সংসদ সদস্য সংখ্যা ৯০ জন বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফলে সংসদে দলীয় শক্তির হিসাবে মির্জা ফখরুলের অবস্থান শক্তিশালী হলেও দুই প্রার্থী থাকায় নির্বাচনটি আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হচ্ছে।
দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়া যাবে?
রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে সংসদ সদস্যদের ভোটদানের ক্ষেত্রে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ গুরুত্বপূর্ণ। এই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, কোনো সংসদ সদস্য দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে গিয়ে ভোট দিলে তার সংসদ সদস্যপদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে।
এ কারণে রাজনৈতিক দলগুলোর সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের ফলাফলে বড় ভূমিকা রাখবে। বিশেষ করে ক্ষমতাসীন দলের সংসদীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় তাদের প্রার্থীকে জয়ী করার ক্ষেত্রে দলীয় অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রপতি পদ কেন শূন্য হলো?
গত ২৪ জুলাই মো. সাহাবুদ্দিন রাষ্ট্রপতি পদ থেকে পদত্যাগ করেন। সংবিধান অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি পদ শূন্য হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করতে হয়।
সেই সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা পূরণ করতেই নির্বাচন কমিশন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করে।
এবার নির্বাচনের গুরুত্ব কোথায়?
রাষ্ট্রপতি পদে ৩৫ বছর পর সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট হওয়ায় এবারের নির্বাচন রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ। যদিও সংসদে ক্ষমতাসীন বিএনপির সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণে ফলাফল সম্পর্কে রাজনৈতিক মহলে একটি পরিষ্কার ধারণা রয়েছে, তবু দুই প্রার্থীর মধ্যে আনুষ্ঠানিক ভোটগ্রহণ দেশের সাংবিধানিক ও সংসদীয় রাজনীতিতে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
একদিকে এটি দীর্ঘ সময় পর রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ তৈরি করেছে, অন্যদিকে সংসদীয় ভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন প্রক্রিয়াও নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
২০ আগস্টের ভোটে কী হবে?
আগামী ২০ আগস্ট নির্ধারিত সময়ে সংসদ সদস্যরা ভোট দেবেন। বিকেল ৫টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর একই স্থানে ব্যালট গণনা করা হবে। এরপর নির্বাচনী কর্তা ফল ঘোষণা করবেন এবং গেজেট প্রকাশের মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে।
দুই প্রার্থী মনোনয়ন প্রত্যাহার না করায় এখন পুরো নজর ভোটের দিনের দিকে। দীর্ঘ ৩৫ বছর পর রাষ্ট্রপতি পদে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনে শেষ পর্যন্ত মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নাকি অলি আহমদ—কে নতুন রাষ্ট্রপতি হিসেবে নির্বাচিত হন, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

