‘পতিত স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তন হয় না’ মন্তব্য করে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, যারা পালিয়ে যায়, তারা আর দেশে ফিরতে পারে না। শেখ হাসিনার সঙ্গে বিশ্বের অন্য কোনো ফ্যাসিস্টের তুলনাও চলে না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রোববার (১৬ আগস্ট) দুপুরে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সিলেট হলে আয়োজিত ‘জুলাইয়ের চেতনা ও আগামীর বাংলাদেশ’ শীর্ষক আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন রিজভী। জুলাই গণঅভ্যুত্থান ২০২৪-এর দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে এ আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।
রিজভী বলেন, মুসোলিনি কিংবা হিটলারের সঙ্গেও শেখ হাসিনার তুলনা চলে না। তাঁর দাবি, মুসোলিনি ও হিটলারের অন্তত নিজস্ব দেশপ্রেম ছিল এবং তারা নিজেদের দেশকে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন। বিপরীতে শেখ হাসিনা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব বিসর্জন দিয়েও ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছেন বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, শেখ হাসিনার একমাত্র লক্ষ্য ছিল ক্ষমতায় থাকা। ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য জনগণের ওপর অত্যাচার, নির্যাতন ও রক্তপাতকে তিনি গুরুত্ব দেননি। জনগণের মধ্যে যে বড় ধরনের ক্ষোভ ও শক্তি তৈরি হয়েছিল, তা তিনি বুঝতে পারেননি বলেও মন্তব্য করেন রিজভী।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভিন্নমতের সুযোগ ছিল না
রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, ফ্যাসিবাদের প্রভাব এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল যে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিরোধী মতের কোনো জায়গা ছিল না। ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছিল।
তিনি অভিযোগ করেন, এ সময় ভিন্নমত পোষণকারী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা বিভিন্নভাবে আক্রান্ত হয়েছেন। তাঁর বক্তব্যে আসিফ নজরুলের চেম্বারে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের ভাঙচুরের বিষয়টিও উঠে আসে। কথা বলার কারণে অনেক শিক্ষক চাকরি হারিয়েছেন বলেও দাবি করেন তিনি।
রিজভী বলেন, শিক্ষকরা চাকরির বেতন দিয়েই সংসার চালান। কিন্তু মতপ্রকাশের কারণে অনেকে চাকরি হারিয়েছেন। দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা এই ক্ষোভই একপর্যায়ে জুলাইয়ে বিস্ফোরণের রূপ নেয়। তাঁর মতে, জুলাই ছিল দীর্ঘদিনের সঞ্চিত ক্ষোভের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
‘জুলাইয়ের চেতনা’ কী
জুলাইয়ের চেতনা প্রসঙ্গে রিজভী বলেন, চেতনা হচ্ছে হৃদয়ের বন্ধন। দেশে বহুদলীয় ও বহুমাত্রিক গণতন্ত্রকে সুপ্রতিষ্ঠিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যতে নতুন করে কোনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ না পায়।
তিনি বলেন, এখনো অনেকে দাবি করেন, আগের সময় ভালো ছিল। তাঁর অভিযোগ, ফ্যাসিবাদের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা এখনো বিভিন্ন জায়গায় সক্রিয় এবং তাদের বিপুল অর্থ রয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও তারা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
রিজভী বলেন, ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে তাঁর বিশ্বাস—এ ধরনের পতিত স্বৈরাচারের প্রত্যাবর্তন হয় না। তবে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকাঠামো ও সমাজ প্রতিষ্ঠায় ভুল হলে ফ্যাসিবাদ অন্য কোনো পথ বা চোরাগলি দিয়ে ফিরে আসার চেষ্টা করতে পারে।
‘তারা যা করেছে, আমরা তার বিপরীত করব’
বিএনপির এই নেতা বলেন, অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিটি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে যে, আগের সরকারের করা কাজের বিপরীত পথেই দেশকে এগিয়ে নেওয়া হবে।
রিজভীর অভিযোগ, আগের সরকার দলীয়করণ ও আওয়ামীকরণ করেছে, দেশের রাজকোষ শূন্য করেছে, ব্যাংক লুটপাট করেছে এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করেছে। এসবের বিপরীতে সুশাসন, গণতন্ত্র ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা গেলে গণতন্ত্র দেশের মাটিতে আরও শক্ত ভিত্তি পাবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়েও সমালোচনা
গত ১৭ বছরের শিক্ষা পরিস্থিতি নিয়েও সমালোচনা করেন রিজভী। তাঁর দাবি, এই সময়ে দেশে প্রকৃত অর্থে শিক্ষার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছে এবং মেধা ধ্বংসের চেষ্টা করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ফলাফল প্রকাশের সময় শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রকৃত পরিস্থিতি সামনে আসা জরুরি। যোগ্যতা ও মেধা অনুযায়ী ফলাফল নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন তিনি।
রিজভীর ভাষ্য অনুযায়ী, অতীতে অনেক শিক্ষার্থী যথাযথভাবে না লিখেও পাস করেছে এবং জিপিএ-৫ পেয়েছে। তাঁর মতে, একজন শিক্ষার্থীর যতটুকু মেধা ও যোগ্যতা, ফলাফলেও তার যথাযথ প্রতিফলন থাকা উচিত।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপউপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, অধ্যাপক ড. লুৎফর রহমান, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. নাজমুল হোসাইনসহ বিভিন্ন কর্মকর্তা-কর্মচারী উপস্থিত ছিলেন। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটেও উপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. এ এস এম আমানুল্লাহ এবং উপউপাচার্য হিসেবে অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর নাম উল্লেখ রয়েছে।

