পরিবেশ ডেস্ক
কক্সবাজারের মহেশখালী উপজেলার শাপলাপুর এলাকায় দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক নির্মাণের কাজ চলছে। প্রায় দেড় কিলোমিটার অংশে পাকা রাস্তা ১৮ ফুট প্রশস্ত করার উদ্যোগে ঝুঁকিতে পড়েছে সংরক্ষিত বনভূমি ও বন্য প্রাণীর আবাসস্থল।
শাপলাপুরের জেএম ঘাট থেকে শুরু হওয়া সংরক্ষিত বনের ভেতর দিয়ে বর্তমানে একটি পাকা রাস্তা রয়েছে। ওই রাস্তা প্রশস্ত করার কাজের অংশ হিসেবে বিভিন্ন স্থানে ঢালাই করা হচ্ছে। বন বিভাগের নথি অনুযায়ী, এই এলাকায় সংরক্ষিত বনের জমিতে বসতি, দোকান ও অন্যান্য স্থাপনা গড়ে উঠেছে। বন বিভাগ এসব বাসিন্দাকে বনভূমির অবৈধ দখলদার হিসেবে উল্লেখ করেছে।
সড়ক হলে সুবিধা পাবে বনভূমির দখলদাররা
বন বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, শাপলাপুরের ১৮ হাজার ২৮৬ একর সংরক্ষিত বনভূমির মধ্যে চার হাজারের বেশি মানুষ অবৈধভাবে বসতি ও দোকানপাট গড়ে তুলেছেন। সড়কটি নির্মাণ হলে এসব এলাকার মানুষের যোগাযোগ সহজ হবে এবং বনভূমিতে দখল আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে বন বিভাগ।
স্থানীয় পরিবেশকর্মীরাও বলছেন, বনভূমির ভেতর যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হলে সেখানে নতুন করে ঘরবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠার প্রবণতা বাড়তে পারে। এতে সংরক্ষিত বনের অবশিষ্ট অংশও ক্ষতির মুখে পড়বে।
নির্মাণে ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ব্যয়
জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি—জাইকার অর্থায়নে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছে ২২ কোটি ৩৭ লাখ টাকা।
এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলীর ভাষ্য, সড়কটি নির্মাণ হলে শাপলাপুর ইউনিয়নের সঙ্গে পাশের ইউনিয়নের যোগাযোগের দূরত্ব ২০ কিলোমিটার থেকে কমে প্রায় সাড়ে চার কিলোমিটারে নেমে আসবে।
তবে এই সড়ক ব্যবহার করে ঠিক কত মানুষ সরাসরি উপকৃত হবেন, সে বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার কাছ থেকে নির্দিষ্ট কোনো সংখ্যা পাওয়া যায়নি।
আদালতের নিষেধাজ্ঞার মধ্যেও চলছে কাজ
সড়ক নির্মাণ বন্ধে আদালতের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানেন। তবে আদেশের নথি হাতে না পাওয়ার কথা জানিয়েছেন এলজিইডির উপজেলা প্রকৌশলী।
অন্যদিকে বন বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তা জানিয়েছেন, সংরক্ষিত বনে আইন অনুযায়ী কোনো ধরনের স্থাপনা বা অবকাঠামো নির্মাণের সুযোগ নেই। বন বিভাগ কাজ বন্ধ করার চেষ্টা করলেও তা উপেক্ষা করে নির্মাণকাজ চালিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় মামলাও করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
বন্য প্রাণীর আবাসস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা
সড়ক নির্মাণের বিষয়ে বন বিভাগ জানিয়েছে, শাপলাপুরের এই বনাঞ্চলে চিত্রা হরিণ, মায়া হরিণ, সংকটাপন্ন পাহাড়ি কচ্ছপ, মুখপোড়া হনুমান, অজগরসহ বিভিন্ন প্রজাতির বন্য প্রাণী ও সরীসৃপের আবাসস্থল রয়েছে।
বনের ভেতর সড়ক নির্মাণ হলে প্রাণীদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হতে পারে। পাশাপাশি পুরোনো গাছ কাটা, বনভূমিতে নতুন করে দখল বাড়া এবং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বন বিভাগের এক চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রাকৃতিক বন ও বাস্তুতন্ত্র দীর্ঘ সময় ধরে বিভিন্ন উদ্ভিদ, প্রাণী, মাটির অণুজীব, কীটপতঙ্গ ও জলাধারের পারস্পরিক সম্পর্কের মাধ্যমে গড়ে ওঠে। সড়ক নির্মাণের মতো অবকাঠামোগত পরিবর্তনে সেই ভারসাম্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
আইন নিয়েও প্রশ্ন
প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণ আইন-২০২৬’ অনুযায়ী প্রাকৃতিক বনকে বনবিরুদ্ধ বা বনবহির্ভূত কাজে ব্যবহার করা যাবে না। জাতীয় বননীতি ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনাতেও সংরক্ষিত বনের ভেতর স্থাপনা ও অবকাঠামো নির্মাণের বিষয়ে বিধিনিষেধ রয়েছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) বলছে, মহেশখালী দেশের গুরুত্বপূর্ণ পাহাড়ি জীববৈচিত্র্যসমৃদ্ধ অঞ্চলগুলোর একটি। সেখানে সংরক্ষিত বনের ভেতর সড়ক নির্মাণ হলে বন উজাড় ও দখলের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।

