জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর বন্ধ থাকা বাংলাদেশ-ভারত আন্তদেশীয় ট্রেন চলাচল পুনরায় চালুর আগ্রহ প্রকাশ করেছে ভারত। তবে এ বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাব পায়নি বাংলাদেশ। রেলপথ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ভারতই ট্রেন চলাচল বন্ধ করেছিল, তাই তাদের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ আসতে হবে। চিঠি পেলে এ বিষয়ে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেবে ঢাকা।
শনিবার (১০ অক্টোবর) একাত্তরের এক প্রতিবেদনে এসব তথ্য জানানো হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে ট্রেন চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে আলোচনা চলছে। গত সেপ্টেম্বরে এ নিয়ে উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদের একটি বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়।
ট্রেন চালুতে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাবের অপেক্ষায় বাংলাদেশ
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব ফাহিমুল ইসলাম একাত্তরকে বলেন, যেহেতু ভারতই ট্রেন চলাচল বন্ধ করেছিল, তাই তাদের পক্ষ থেকেই আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ নিতে হবে। তবে ট্রেন চালুর বিষয়ে বাংলাদেশের প্রস্তুতি ও সদিচ্ছা রয়েছে। আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাওয়া মাত্রই এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দেওয়া হবে।
কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলের ধারণা, নির্বাচিত সরকারের আমলে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে রেল যোগাযোগ পুনরায় চালুর বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
কেন বন্ধ হয়েছিল বাংলাদেশ-ভারত ট্রেন চলাচল?
২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তার কারণ দেখিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলাচলকারী আন্তদেশীয় যাত্রীবাহী ট্রেনগুলোর চলাচল স্থগিত করা হয়। ১৬ জুলাই মৈত্রী এক্সপ্রেসের চলাচল বন্ধ করা হয়। এরপর ১৯ জুলাই থেকে মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস—তিনটি ট্রেনের চলাচলই স্থগিত হয়।
পরবর্তীতে ট্রেনগুলো পুনরায় চালুর জন্য বাংলাদেশ দিল্লির কাছে চিঠি পাঠিয়েছিল। তবে তখন ভারতের পক্ষ থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সম্প্রতি ভারত মৌখিকভাবে ট্রেন চালুর আগ্রহ প্রকাশ করেছে।
বাংলাদেশ-ভারত রেল যোগাযোগের গুরুত্ব
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে আন্তদেশীয় রেল যোগাযোগ সাধারণ মানুষের যাতায়াত, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দুই দেশের পারস্পরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান মনে করেন, ট্রেন চলাচল পুনরায় চালু হলে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, দীর্ঘসূত্রতা এড়িয়ে পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে দ্রুত রেল যোগাযোগ চালু করা উচিত।
তিনটি ট্রেনের যাত্রীসংখ্যা ও আয়
বাংলাদেশ-ভারত রেল যোগাযোগের ইতিহাসে মৈত্রী, বন্ধন ও মিতালী এক্সপ্রেস গুরুত্বপূর্ণ। ২০০৮ সালের ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখে ঢাকা-কলকাতা রুটে মৈত্রী এক্সপ্রেস চালু হয়। এরপর ২০১৭ সালের ৯ নভেম্বর খুলনা-কলকাতা রুটে চালু হয় বন্ধন এক্সপ্রেস। ঢাকা-নিউ জলপাইগুড়ি রুটে মিতালী এক্সপ্রেসের যাত্রা শুরু হয় ২০২২ সালের ১ জুন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছর থেকে ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই পর্যন্ত মৈত্রী এক্সপ্রেসে মোট ২ লাখ ৮৮ হাজার ৩৬০ জন যাত্রী যাতায়াত করেন। তাঁদের মধ্যে প্রায় ৯৫ শতাংশ ছিলেন বাংলাদেশি।
স্বাভাবিক সময়ে ট্রেনগুলোতে যাত্রী পূর্ণ থাকার হার ছিল ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ। ঈদ ও দুর্গাপূজার ছুটিতে এ হার ৯৫ শতাংশ ছাড়িয়ে যেত।
দুই দেশের মধ্যে ট্রেন চলাচলসংক্রান্ত চুক্তি অনুযায়ী, এ সেবা থেকে অর্জিত আয়ের ৭৫ শতাংশ পায় বাংলাদেশ রেলওয়ে এবং বাকি ২৫ শতাংশ পায় ভারতীয় রেলওয়ে।
কবে চালু হবে ট্রেন?
বাংলাদেশ-ভারত ট্রেন চলাচল পুনরায় চালুর বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক সময়সূচি ঘোষণা করা হয়নি। ভারতের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব পাওয়ার পরই এ বিষয়ে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে রেলপথ মন্ত্রণালয়।
সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা, দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক আলোচনা এগোলে দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা যাত্রীবাহী ট্রেনগুলো পুনরায় চালু হতে পারে। তবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ও সম্ভাব্য যাত্রা শুরুর তারিখ এখনো অনিশ্চিত।
তথ্যসূত্র: একাত্তর টেলিভিশন।

