বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে গোপন রাজনৈতিক প্রচারণা চালানো ও ভোটারদের প্রভাবিত করার অভিযোগ উঠেছে ভারতের কয়েকটি রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। কেনিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানির পর এবার যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনেও এসব প্রতিষ্ঠানের সংশ্লিষ্টতার তথ্য সামনে এসেছে।
ভুয়া পরিচয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট পরিচালনা, বট ব্যবহার এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে নির্দিষ্ট প্রার্থী বা রাজনৈতিক পক্ষের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করছে এসব চক্র। কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আলজাজিরার এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এমন তথ্য উঠে এসেছে।
কেনিয়ার নির্বাচন থেকে শুরু যেভাবে
আলজাজিরার অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ২০২২ সালে কেনিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে উইলিয়াম রুটোর পক্ষে প্রচারণার কনটেন্ট তৈরি করতেন ভারতের গুজরাটের আহমেদাবাদে বসবাসকারী ২২ বছর বয়সী রাজন কুমার।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিদিন মাত্র ৭ ডলারের বিনিময়ে পোস্টার তৈরি ও ভিডিও সম্পাদনার কাজ করতেন তিনি। তবে তাঁর তৈরি কনটেন্ট রুটোর আনুষ্ঠানিক প্রচারমাধ্যমে প্রকাশ করা হতো না। বরং পরিচয় গোপন রাখা বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট থেকে সেগুলো ছড়িয়ে দেওয়া হতো। উদ্দেশ্য ছিল, সমন্বিত প্রচারণাকে সাধারণ মানুষের স্বতন্ত্র মতামত হিসেবে উপস্থাপন করা।
রাজন কুমারের ভাষ্য অনুযায়ী, বিরোধী নেতাদের বক্তব্যের কিছু অংশ কেটে এমনভাবে প্রচার করা হতো, যাতে বক্তব্যের মূল অর্থ বদলে যায়। কোনো প্রার্থীর জনপ্রিয়তা ও নির্বাচনী সম্ভাবনা নিয়ে মিথ্যা তথ্য ছড়ানোর পাশাপাশি নারী রাজনীতিকদের সুনাম ক্ষুণ্ন করতে ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়েও গুজব ছড়ানো হতো।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনেও গোপন প্রচারণার অভিযোগ
আলজাজিরার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ভারত থেকে পরিচালিত বেশ কিছু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট নির্দিষ্ট রাজনৈতিক প্রচারণায় যুক্ত ছিল।
গত ৪ আগস্ট মিশিগানে ডেমোক্রেটিক পার্টির সিনেট প্রাইমারির আগে রাজনীতিক হ্যালি স্টিভেনসের পক্ষে এমন প্রচারণার তথ্য প্রথম প্রকাশ করে নিউইয়র্ক টাইমস। ওই প্রাইমারিতে তিনি আবদুল এল-সাইয়েদের কাছে পরাজিত হন।
অনলাইনে বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণা পর্যবেক্ষণকারী গবেষণা গোষ্ঠী অ্যান্টিবট৪নাভালনি আলজাজিরাকে জানিয়েছে, হ্যালি স্টিভেনসের পক্ষে ভিডিও ছড়ানো অন্তত ২৮টি সমন্বিত অ্যাকাউন্টের সন্ধান পেয়েছে তারা। এসব পোস্ট মোট ৭০ লাখের বেশি বার দেখা হয়েছে।
আলজাজিরার পর্যালোচনায় দেখা গেছে, শনাক্ত করা অ্যাকাউন্টগুলোর অন্তত ১৫টি ভারত থেকে পরিচালিত হচ্ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ক্লেমসন বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডিয়া ফরেনসিক হাবের গবেষকেরাও একই ধরনের প্রচারণায় ভারতীয় অ্যাকাউন্ট ও পেজ ব্যবহারের তথ্য পেয়েছেন।
ভুয়া পরিচয় ও গোপন অর্থায়নে প্রচারণা
প্রতিবেদন অনুযায়ী, নির্বাচনী প্রচারণায় বিতর্কিত ও অতিরঞ্জিত কনটেন্ট ছড়াতে বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে রাজনৈতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো। কখনো আগে থেকে থাকা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়, কখনো নতুন পেজ তৈরি করে। আবার কখনো অন্যের কাছ থেকে পেজ ভাড়া নিয়েও প্রচারণা চালানো হয়।
এসব পেজ থেকে এমন রাজনৈতিক বক্তব্য ও কনটেন্ট ছড়ানো হয়, যা সরাসরি কোনো রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নীতিমালায় ভুয়া পরিচয় ব্যবহার, অ্যাকাউন্ট কেনাবেচা এবং রাজনৈতিক বিজ্ঞাপনের অর্থদাতার পরিচয় গোপন রাখার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভারতীয় পরামর্শকেরা এসব নিয়মের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে কার্যক্রম চালানোর কথা জানিয়েছেন।
প্রয়োজনে ভার্চুয়াল প্রাইভেট নেটওয়ার্ক বা ভিপিএন ব্যবহার করে অন্য দেশের পরিচয়ে অ্যাকাউন্ট পরিচালনা ও বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়।
অর্থ লেনদেনেও গোপন পদ্ধতি ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজন পরামর্শকের দাবি, বিদেশি প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া কাজের চুক্তি দেখিয়ে অর্থ পাঠানো হয়। এ ছাড়া প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থার বাইরে হুন্ডি নেটওয়ার্ক ব্যবহার করেও সীমান্ত পেরিয়ে অর্থ লেনদেন করা হয়।
বিভিন্ন দেশে বিস্তৃত ভারতীয় পরামর্শকদের কার্যক্রম
আলজাজিরাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ভারতের রাজনৈতিক পরামর্শক তুষার গিরি দাবি করেন, ভারত এখন গোপন রাজনৈতিক প্রচারণার বড় বাজারে পরিণত হয়েছে। কম খরচে ভারত থেকে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নির্বাচনে প্রভাব বিস্তারের প্রচারণা পরিচালনা করা সম্ভব।
প্রতিবেদনে কেনিয়া, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, অস্ট্রেলিয়া ও জার্মানিসহ বিভিন্ন দেশে ভারতীয় রাজনৈতিক পরামর্শকদের কাজ করার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ সুরিনামের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণায় যুক্ত হওয়ার বিষয়েও ভারতীয় পরামর্শকদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এসব কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টিও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। ২০২২ সালে কেনিয়ার নির্বাচনের আগে উইলিয়াম রুটোর প্রচারণায় কাজ করা দুই ভারতীয় পরামর্শক জুলফিকার আহমেদ খান ও মোহাম্মদ জায়েদ সামি কিদওয়াই নাইরোবিতে নিখোঁজ হন। পরে অক্টোবরে তাঁদের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তাঁদের অপহরণের ঘটনায় কেনিয়ার একটি বিশেষ পুলিশ ইউনিটের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে। তবে ২০২৬ সালের আগস্টে প্রসিকিউশনের আবেদনের পর দেশটির হাইকোর্ট হত্যা মামলার অভিযোগ বাতিল করেন।
সব মিলিয়ে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে এক দেশের রাজনৈতিক প্রচারণা অন্য দেশে ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ নতুন করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশেষ করে ভুয়া পরিচয়, গোপন অর্থায়ন ও পরিকল্পিত বিভ্রান্তিমূলক প্রচারণার মাধ্যমে নির্বাচনী পরিবেশ প্রভাবিত করার বিষয়টি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

