নিজস্ব প্রতিবেদক,
বাগেরহাটে এ মৌসুমে সবজির বাম্পার ফলন হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে জেলার প্রায় ৭ হাজার ১৮২ হেক্টর জমিতে সবজি চাষ হয়েছে। এসব জমিতে উৎপাদিত সবজির আনুমানিক বাজারমূল্য দাঁড়িয়েছে ২৮৯ কোটি ৪৮ লাখ টাকা। তবে উৎপাদন ভালো হলেও ন্যায্য দাম না পাওয়ায় কৃষকদের লাভ কমে যাচ্ছে। সার, কীটনাশকসহ উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কৃষক কাঙ্ক্ষিত মুনাফা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
চলতি মৌসুম ১৬ মার্চ থেকে ১৫ অক্টোবর পর্যন্ত। জেলার অন্যতম সবজিপ্রধান উপজেলা ফকিরহাটে প্রায় ৩০ হাজার টন সবজি উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে, যার আনুমানিক মূল্য ৬০ কোটি টাকা। চিতলমারীতে উৎপাদিত সবজির মূল্য প্রায় ৬৪ কোটি এবং মোল্লাহাটে প্রায় ৫০ কোটি টাকা। কচুয়া উপজেলার গাছশিয়া বাজারে মৌসুমজুড়ে প্রায় ৪ থেকে ৫ কোটি টাকার সবজি কেনাবেচা হয়।
সম্প্রতি বাগেরহাট সদর উপজেলার বড়াকপুর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বিপুল পরিমাণ করলা ও শসা নিয়ে বাজারে আসছেন। বাজারে প্রতি কেজি শসা প্রায় ১১ টাকা এবং করলা ২৩ থেকে ২৮ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল।
উৎপাদন বেশি, কৃষকের লাভ কম
সিঙ্গিমারী বিল এলাকায় পাঁচ বিঘা জমিতে করলা, শসা, মিষ্টিকুমড়া ও তরমুজ চাষ করেছেন ৬০ বছর বয়সী কৃষক বিকাশ পাল। শনিবার তিনি বাজারে প্রায় ৩০ কেজি করলা ও ১১ কেজি শসা আনেন। করলা প্রতি কেজি ২৩ টাকা দরে পাইকারি বিক্রি করেছেন তিনি।
বিকাশ পাল বলেন, এ বছর ফলন ভালো হয়েছে। কিন্তু সার, কীটনাশক ও অন্যান্য কৃষি উপকরণের দাম বেশি হওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। ফলে ভালো ফলন হলেও তাঁর লাভ কম হচ্ছে।
বিকাশ পালের মেয়ে তিথি পাল জানান, গত বছর প্রতি কেজি শসা ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং করলা ৩৫ থেকে ৪০ টাকা দরে বিক্রি হয়েছিল। এবার দাম অনেক কম হওয়ায় কৃষকেরা প্রত্যাশিত লাভ করতে পারছেন না।
শশীকালী বিল এলাকায় এক বিঘা জমিতে করলা ও মিষ্টিকুমড়া চাষ করেছেন ৪২ বছর বয়সী কৃষক সুদেব দাস। তিনি জানান, চাষে প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এ পর্যন্ত জমি থেকে ৬ থেকে ৭ হাজার টাকার সবজি বিক্রি করতে পেরেছেন। ওই দিন করলা বিক্রি করেছেন কেজিপ্রতি ২৬ টাকা দরে।
তাঁর অভিযোগ, উৎপাদন ভালো হলেও সার, কীটনাশকসহ অন্যান্য উপকরণের বাড়তি খরচ লাভ কমিয়ে দিচ্ছে। বাজারে সবজি বিক্রির জন্য তাঁকে ৬ টাকা বাজার ফিও দিতে হয়েছে। পাশাপাশি বাজারে একটি চক্র দাম প্রভাবিত করছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।
সিন্ডিকেটের অভিযোগ নাকচ কৃষি বিভাগের
তবে বাজারে কোনো সিন্ডিকেটের মাধ্যমে সবজির দাম নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ নাকচ করেছে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর।
বাগেরহাটের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. মতাহার হোসেন বলেন, জেলায় সবজির দাম কম থাকার কারণ সিন্ডিকেট নয়, বরং উৎপাদন বেশি হওয়া। প্রচুর সবজি উৎপাদন হওয়ায় ভোক্তারা তুলনামূলক কম দামে পণ্য কিনতে পারছেন।
তিনি বলেন, কৃষকেরা উৎপাদন বাড়াতে কঠোর পরিশ্রম করছেন এবং কৃষি বিভাগও তাঁদের আরও সবজি চাষে উৎসাহিত করতে কাজ করছে।
ঢাকায় যাচ্ছে প্রতিদিনের সবজি
বাগেরহাটের অতিরিক্ত উৎপাদিত সবজির একটি বড় অংশ যাচ্ছে দেশের বিভিন্ন বাজারে। শ্রীঘাট এলাকা থেকে সবজি কিনে ঢাকার যাত্রাবাড়ী পাইকারি বাজারে সরবরাহ করেন ব্যবসায়ী সিরাজ ব্যাপারী। তাঁর ভাষ্য, প্রতি সপ্তাহে ওই এলাকা থেকে ২০ থেকে ২৫ ট্রাক সবজি ঢাকায় যাচ্ছে।
বড়াকপুর বাজারেও দেখা গেছে, রাস্তার পাশে সারি সারি তাজা করলা ও শসার স্তূপ। কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বস্তায় সবজি ভরে বিভিন্ন পরিবহনে তুলে দিচ্ছেন।
অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে ভোক্তারা তুলনামূলক কম দামে সবজি পেলেও কৃষকদের হিসাবটি ভিন্ন। তাঁদের জন্য বাম্পার ফলন তখনই স্বস্তির কারণ হবে, যখন উৎপাদন খরচের তুলনায় ন্যায্য দাম নিশ্চিত হবে।

