দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মানুষ একে অপরের দেশকে কীভাবে মূল্যায়ন করেন, তা নিয়ে ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টার পরিচালিত জরিপে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মানুষের পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের চিত্র উঠে এসেছে।
পিউ রিসার্চের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ৫১ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন। বিপরীতে ভারতের বিষয়ে ৪২ শতাংশ বাংলাদেশি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছেন। অর্থাৎ, ভারতের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণকারীর হার ইতিবাচক মনোভাবের চেয়ে বেশি।
বাংলাদেশের মানুষের ভারত-সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গিতে সাম্প্রতিক সময়ে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনও দেখা গেছে। আগের জরিপের তুলনায় ভারতের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ইতিবাচক মনোভাব ১৫ শতাংশ কমেছে। একই সময়ে ভারত সম্পর্কে কোনো মতামত নেই—এমন মানুষের হারও কমেছে। আগের জরিপে এই হার ছিল ২৪ শতাংশ, যা এবার কমে ৭ শতাংশে নেমেছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের প্রতি ভারতের মানুষের ইতিবাচক মনোভাব তুলনামূলকভাবে কম। জরিপে দেখা গেছে, ভারতের ২৫ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে দেখেন। বিপরীতে পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মানুষের মধ্যে বাংলাদেশের বিষয়ে ইতিবাচক মনোভাব বেশি। পাকিস্তানের ৬৬ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ৫৬ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশকে ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন।
পিউ রিসার্চের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের পর বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতীয়দের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিও কমেছে। বর্তমানে ভারতের ৪৮ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশের প্রতি নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেন।
বাংলাদেশের প্রতি পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মানুষের নেতিবাচক মনোভাব তুলনামূলকভাবে কম। জরিপ অনুযায়ী, পাকিস্তানের ২২ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ১৮ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশকে নেতিবাচকভাবে দেখেন। একই সময়ে ২০২৪ সালের তুলনায় বাংলাদেশ সম্পর্কে শ্রীলঙ্কার মানুষের ইতিবাচক মনোভাব ৯ শতাংশ বেড়েছে।
বাংলাদেশের মানুষের শ্রীলঙ্কা-সম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গিতেও ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা গেছে। জরিপে দেশটির প্রতি বাংলাদেশের মানুষের ইতিবাচক মনোভাব ১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতকে নিয়ে জনমত
প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে ভারতকে ঘিরে দক্ষিণ এশিয়ায় কিছুটা ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। কোন দেশকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে দেখা হয়—এমন প্রশ্নেও অংশগ্রহণকারীদের মতামতে পার্থক্য রয়েছে।
জরিপে দেখা গেছে, শ্রীলঙ্কার ৬৩ শতাংশ মানুষ ভারতকে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র হিসেবে বিবেচনা করেন। এর মাধ্যমে দেশটির মানুষের কাছে ভারতের আঞ্চলিক গুরুত্বের বিষয়টি স্পষ্ট হয়।
এর আগে ২০২৪ সালের পিউ রিসার্চের দক্ষিণ এশিয়া-ভিত্তিক জরিপেও প্রতিবেশী দেশগুলোর প্রতি মানুষের মনোভাবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা গিয়েছিল। সেই জরিপে বাংলাদেশের ৫৭ শতাংশ মানুষ ভারতের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব জানিয়েছিলেন এবং ৩৯ শতাংশ নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করেছিলেন। একই জরিপে ভারতের ৩৫ শতাংশ মানুষ বাংলাদেশকে ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই পরিবর্তন
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ভৌগোলিক, অর্থনৈতিক, বাণিজ্যিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। দুই দেশের মধ্যে সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, নিরাপত্তা, যোগাযোগ ও আঞ্চলিক সহযোগিতার মতো বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ফলে এক দেশের মানুষের অন্য দেশ সম্পর্কে জনমত দুই দেশের সামগ্রিক সম্পর্কের ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বিশেষ করে আগের জরিপের তুলনায় ভারতের প্রতি বাংলাদেশের ইতিবাচক মনোভাব কমে নেতিবাচক মনোভাব বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি জনমতের পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে কোনো একটি জরিপের ফলাফলকে দুই দেশের সব মানুষের সামগ্রিক অবস্থান হিসেবে বিবেচনা না করে, জরিপের সময়কাল, নমুনা, প্রশ্নের ধরন এবং সামগ্রিক রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপটের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের এসব তথ্য দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক ও জনমত বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ একটি চিত্র তুলে ধরেছে।

