দেশের তৈরি পোশাকশিল্প নানা সংকট ও চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেও রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি এখনো অনেক কম। একদিকে পোশাক রপ্তানি বাড়ছে, অন্যদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির চাপে শ্রমিকদের জীবন কঠিন হয়ে উঠছে। এ পরিস্থিতিতে মজুরি বাড়ানোর দাবিতে বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে আন্দোলন করছেন পোশাকশ্রমিকেরা।
শ্রমিকদের আন্দোলনের মুখে গত রোববার নতুন মজুরি বোর্ড গঠন করেছে শ্রম মন্ত্রণালয়। তবে বোর্ড গঠনের পরও বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভ অব্যাহত রয়েছে। শ্রমিকনেতাদের অভিযোগ, সময়মতো মজুরি পুনর্নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হলে বর্তমান পরিস্থিতি এড়ানো সম্ভব হতো। অন্যদিকে মালিকপক্ষের দাবি, শ্রমিকদের উৎপাদনশীলতা, পোশাকের কম দাম এবং উৎপাদনে কম মুনাফার কারণে বাংলাদেশের মজুরি তুলনামূলক কম।
রপ্তানিতে বাংলাদেশের অবস্থান শক্তিশালী
গত দেড় দশকে নানা সংকটের মধ্যেও বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ২০১২ সালে তাজরীন ফ্যাশনসে অগ্নিকাণ্ড এবং ২০১৩ সালে রানা প্লাজা ধসের পর দেশের পোশাকশিল্প বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে। পরে কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা উন্নয়নের উদ্যোগে আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের আস্থা ফিরে আসে।
এরপর কোভিড মহামারি, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তন, যুক্তরাষ্ট্রের পাল্টা শুল্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের মতো পরিস্থিতিও মোকাবিলা করেছে এ শিল্প।
২০১১ থেকে ২০২৫ সালের মধ্যে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। ২০২৫ সালে ৩ হাজার ৮৮২ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় দশমিক ৮৮ শতাংশ বেশি।
বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে চীনের হিস্যা ছিল ২৭ দশমিক ৫ শতাংশ। দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা বাংলাদেশের হিস্যা ৬ দশমিক ৭৬ শতাংশ। এ ছাড়া ভিয়েতনামের ৬ দশমিক ৫৩ শতাংশ, ভারতের ৩ শতাংশ এবং তুরস্কের ২ দশমিক ৩ শতাংশ হিস্যা ছিল।
পোশাকশিল্পে বড় অঙ্কের করসুবিধা
তিন দশকের বেশি সময় ধরে তৈরি পোশাকশিল্পের উদ্যোক্তারা বিভিন্ন ধরনের করসুবিধা পেয়ে আসছেন। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা ধরে রাখার যুক্তিতে এই সুবিধা দেওয়া হয়।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২-২৩ অর্থবছরে তৈরি পোশাক ও বস্ত্র খাত করপোরেট কর ছাড় পেয়েছে ৫ হাজার ৮২৯ কোটি টাকা। এ খাতের সাধারণ প্রতিষ্ঠানের করপোরেট করহার ১২ শতাংশ। পরিবেশবান্ধব কারখানার ক্ষেত্রে তা ১০ শতাংশ। অন্যদিকে, অন্যান্য খাতের প্রতিষ্ঠানকে ২০ থেকে ৪৫ শতাংশ পর্যন্ত করপোরেট কর দিতে হয়।
করসুবিধার পাশাপাশি পোশাক রপ্তানিতে নগদ সহায়তা ও বন্ড সুবিধাও পান উদ্যোক্তারা। বন্ড সুবিধার আওতায় সুতা, কাপড়সহ বিভিন্ন কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক-কর দিতে হয় না। তবে দেশের অধিকাংশ শিল্প খাত এ ধরনের সুবিধা পায় না।
প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় মজুরি কম
তৈরি পোশাকশিল্পে বর্তমানে শ্রমিকদের ন্যূনতম মাসিক মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে এই মজুরিকাঠামো কার্যকর হয়। সে সময় ডলারের বিনিময় হার ছিল ১১০ টাকা ৫০ পয়সা। ফলে তখন ন্যূনতম মজুরি ছিল প্রায় ১১৩ ডলার। বর্তমানে ডলারের দাম বেড়ে ১২৪ টাকা হওয়ায় টাকার অঙ্ক অপরিবর্তিত থাকলেও ডলারের হিসাবে মজুরি কমে প্রায় ১০১ ডলারে দাঁড়িয়েছে।
এইচঅ্যান্ডএম গ্রুপের গত মার্চের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে পোশাকশ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ১০২ ডলার। অথচ প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে ভারতে ১২৪, পাকিস্তানে ১৩৫, ভিয়েতনামে ১৬৩, ইন্দোনেশিয়ায় ১৭২, কম্বোডিয়ায় ২০৮ এবং চীনে ২৯৪ ডলার।
দেশের পোশাকশিল্প ছাড়াও ট্যানারি, জাহাজভাঙা, করাতকল ও নির্মাণ খাতে ন্যূনতম মজুরি পোশাকশ্রমিকদের তুলনায় বেশি।
নিট পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিকেএমইএর সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে হেলপার পদে অনভিজ্ঞ শ্রমিকেরাও নিয়োগ পান। অভিজ্ঞতা ও দক্ষতার পার্থক্য, উৎপাদনশীলতা এবং কম দামের পোশাক তৈরির কারণে শ্রমিকদের মজুরি তুলনামূলক কম থাকে।
মূল্যস্ফীতির চাপে শ্রমিকদের জীবন
২০২৩ সালে মজুরি বাড়ানোর পরও উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে শ্রমিকেরা সেই বৃদ্ধির সুফল পুরোপুরি পাননি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতি বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছায়। পরবর্তী অর্থবছরেও মূল্যস্ফীতি ছিল ১০ শতাংশ। বিদায়ী অর্থবছরে তা কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশে দাঁড়ায়।
এদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক শ্রমিক খাবারের খরচ কমাতে বাধ্য হচ্ছেন। সংসারের প্রয়োজন মেটাতে ঋণ নেওয়ার প্রবণতাও বেড়েছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিকনেতারা।
গার্মেন্ট শ্রমিক সংহতির সভাপ্রধান তাসলিমা আখতারের ভাষ্য, জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় শ্রমিকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। এ কারণেই তাঁরা মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে রাস্তায় নেমেছেন।
গবেষণাপ্রতিষ্ঠান নলেজ হাব ইনস্টিটিউট ট্রাস্টের সভাপতি খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের ক্ষেত্রে জীবনযাত্রার ব্যয়, মূল্যস্ফীতি, প্রতিযোগী দেশের মজুরি ও উৎপাদনশীলতাসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিতে হয়। তিন বছর আগে শ্রমিকদের জীবনযাত্রার উপযোগী ন্যূনতম মজুরি ১৭ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়েছিল। বর্তমান মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় মজুরি আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।
তাঁর মতে, শুধু মূল মজুরি নয়, খাদ্য ও চিকিৎসা ভাতার পাশাপাশি শিক্ষা, যাতায়াত ও বিনোদন ভাতার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
নতুন মজুরি বোর্ডের দিকে তাকিয়ে শ্রমিকেরা
আগে পাঁচ বছর পরপর পোশাকশ্রমিকদের মজুরি পুনর্নির্ধারণের জন্য মজুরি বোর্ড গঠন করা হতো। তবে শ্রম আইন সংশোধনের মাধ্যমে বর্তমান সরকার এ সময়সীমা কমিয়ে তিন বছর করেছে। সেই হিসাবে ২০২৩ সালের ডিসেম্বরে কার্যকর হওয়া মজুরিকাঠামোর পর নতুন কাঠামো নির্ধারণের সময় ঘনিয়ে এসেছে।
নতুন মজুরি বোর্ড গঠনের পর শ্রমিকদের প্রত্যাশা, জীবনযাত্রার ব্যয় ও বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে এবার বাস্তবসম্মত মজুরি নির্ধারণ করা হবে। রপ্তানি আয় ও শিল্পের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখার পাশাপাশি শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করাই এখন তৈরি পোশাকশিল্পের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ।

