পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালতের প্রধানকে সাময়িক বরখাস্ত করাকে কেন্দ্র করে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। এ ঘটনায় মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছেন প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক ও প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলে সরকার সংস্কার কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে বিরোধী পক্ষ সরকারের পদক্ষেপকে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান দখলের চেষ্টা হিসেবে আখ্যা দিয়েছে।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) টানা দ্বিতীয় রাতের মতো রাজধানী ওয়ারশতে সাংবিধানিক আদালতের বাইরে বিক্ষোভ করেন শত শত মানুষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আদালত প্রাঙ্গণে বিপুলসংখ্যক দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম রয়টার্স ও মার্কিন সংবাদমাধ্যম অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুক্রবার আদালতের জ্যেষ্ঠ বিচারক আনা কোরভিন-পিওত্রোভস্কা আদালতের প্রধান বগদান শভিয়েনচকোভস্কিকে দায়িত্ব থেকে সাময়িক বরখাস্তের ঘোষণা দেন। এরপর থেকে আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও বিচারকদের বৈধ নিয়োগ নিয়ে রাজনৈতিক বিরোধ আরও তীব্র হয়।
প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্কের সরকার বলছে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনতে এ ধরনের পদক্ষেপ প্রয়োজন ছিল। সরকারের অভিযোগ, আগের আইন ও বিচার পার্টির (পিআইএস) সরকারের আমলে বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো রাজনৈতিক প্রভাবের মধ্যে চলে গিয়েছিল।
অন্যদিকে বিরোধী দল ও প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে সরকারের পদক্ষেপকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ওপর জোরপূর্বক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা বলে দাবি করা হচ্ছে।
এদিকে পরিস্থিতির নাটকীয়তায় শুক্রবার সেনেগাল সফরের উদ্দেশ্যে যাত্রা করা প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকির বিমান মাঝপথ থেকে ঘুরিয়ে পোল্যান্ডে ফেরানো হয়। দেশে ফিরে তিনি সাংবিধানিক আদালতে যান। বরখাস্ত হওয়া আদালতপ্রধানকে ভবনে প্রবেশে সহায়তা করেছেন বলেও জানান তিনি।
শুক্রবার রাতে আদালতের নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা এবং পুলিশকে লক্ষ্য করে বস্তু নিক্ষেপের অভিযোগে তিন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়। শনিবারও আদালতের বাইরে বিক্ষোভ অব্যাহত থাকে।
প্রধানমন্ত্রী টাস্ক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, দেশে আইনের শাসন পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা তাঁদের দায়িত্ব। পিআইএসের শাসনামলে বছরের পর বছর আইনের শাসন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ প্রক্রিয়া কঠিন হলেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিকল্প নেই।
কেন এই বিরোধ?
পোল্যান্ডের সাংবিধানিক আদালত নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত অনেক আগের। ২০১৫ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত দেশটির ক্ষমতায় ছিল জাতীয়তাবাদী ও রক্ষণশীল রাজনৈতিক দল আইন ও বিচার পার্টি (পিআইএস)।
দলটির শাসনামলে বিচার বিভাগের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ ও সংস্কার নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে বিতর্ক তৈরি হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অভিযোগ ছিল, এসব সংস্কারের ফলে পোল্যান্ডের বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ নিয়ে জোটটির পক্ষ থেকে পোল্যান্ডের বিরুদ্ধে জরিমানাও আরোপ করা হয়েছিল।
২০২৩ সালে ক্ষমতায় এসে ডোনাল্ড টাস্কের ইউরোপপন্থি সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেয়। তবে সংসদে নির্বাচিত নতুন বিচারকদের নিয়োগ এবং আদালতের পুরোনো নেতৃত্বের সঙ্গে বিরোধের কারণে সংস্কার কার্যক্রম বাধার মুখে পড়ে।
প্রেসিডেন্ট কারোল নাওরোকিও সরকারের বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগের বিরোধিতা করে আসছেন। ফলে আদালতের নিয়ন্ত্রণ ও বিচারকদের বৈধতা নিয়ে প্রধানমন্ত্রী ও প্রেসিডেন্টের মধ্যে বিরোধ আরও গভীর হয়েছে।
রাজনৈতিক মেরুকরণ বাড়ার আশঙ্কা
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সাংবিধানিক আদালতকে ঘিরে চলমান বিরোধ আগামী বছরের সংসদীয় নির্বাচনের আগে পোল্যান্ডের রাজনৈতিক মেরুকরণ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
একদিকে প্রধানমন্ত্রী টাস্কের ইউরোপপন্থি সরকার বিচার বিভাগের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার কথা বলছে। অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট নাওরোকি ও বিরোধী পিআইএস সরকারকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান দখলের অভিযোগে অভিযুক্ত করছে।
শনিবার প্রেসিডেন্ট নাওরোকি বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিদের সঙ্গে জরুরি আলোচনা করেন। তবে প্রধানমন্ত্রী টাস্ক ওই আলোচনায় অংশ নেননি।
এ পরিস্থিতিতে আদালতের কার্যক্রম স্বাভাবিক করা এবং বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার প্রশ্নে পোল্যান্ডের রাজনৈতিক সংকট কোন দিকে মোড় নেয়, এখন সেদিকেই নজর আন্তর্জাতিক মহলের।

