পর্যটকদের জন্য আগামী ১ নভেম্বর থেকে খুলছে দেশের একমাত্র প্রবালসমৃদ্ধ দ্বীপ সেন্ট মার্টিন। দ্বীপটিতে পর্যটকদের যাতায়াত চলবে আগামী ১৫ মার্চ পর্যন্ত। তবে পরিবেশ সংরক্ষণের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ পর্যটককে ভ্রমণের সুযোগ দেওয়া হবে। প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি।
পরিবেশগতভাবে সংকটাপন্ন সেন্ট মার্টিন দ্বীপে পর্যটক যাতায়াত ও পরিবেশ সংরক্ষণ নিয়ে গত ১২ অক্টোবর পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রোববার (২৫ অক্টোবর) এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দপ্তরগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া চলবে না নৌযান
মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌপরিবহন অধিদপ্তর সেন্ট মার্টিনে নৌযান চলাচলের অনুমতি দিতে পারবে না।
এ ছাড়া কক্সবাজারের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল অব্যাহত থাকবে। পরিবেশ সংরক্ষণ ফি আদায়ের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরকে পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০১৬-এর ২৬ নম্বর বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।
সেন্ট মার্টিনে পর্যটক যাতায়াতসংক্রান্ত ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনাগুলোও বহাল থাকবে।
কেন সীমিত করা হচ্ছে পর্যটকের সংখ্যা?
সেন্ট মার্টিন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক পর্যটনকেন্দ্র। দ্বীপটির প্রবাল, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য, উপকূলীয় পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য রক্ষায় পর্যটক চলাচল নিয়ন্ত্রণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার সমস্যা এবং প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর প্রভাব নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। এ কারণে দ্বীপটির পরিবেশ সংরক্ষণের লক্ষ্যে পর্যটকের সংখ্যা সীমিত রাখার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বর্তমান সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দৈনিক পর্যটকসংখ্যা সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ জন নির্ধারণ করা হয়েছে। পাশাপাশি পরিবেশ সংরক্ষণ ফি চালু রাখার মাধ্যমে দ্বীপটির সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আগের মৌসুমে পর্যটকদের জন্য কী নিয়ম ছিল?
গত পর্যটন মৌসুমে সেন্ট মার্টিনে যাতায়াতের ক্ষেত্রে আরও কঠোর সীমাবদ্ধতা ছিল। গত বছরের ১ নভেম্বর দ্বীপটি পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করা হলেও জাহাজ চলাচল বন্ধ থাকায় ওই মাসে পর্যটকেরা সেখানে যেতে পারেননি।
এরপর ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে দ্বীপে রাতযাপনের সুযোগ রাখা হয়েছিল। সে সময় প্রতিদিন সর্বোচ্চ ২ হাজার পর্যটককে ভ্রমণ ও রাত্রিযাপনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল।
এবার দৈনিক পর্যটকসংখ্যার সীমা ৩ হাজার ৫০০ নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে ভ্রমণের তারিখ, জাহাজের সময়সূচি, অনুমোদিত বুকিং এবং রাতযাপনের বিষয়ে চূড়ান্ত নির্দেশনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে জেনে নেওয়া প্রয়োজন।
টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটে জাহাজ চলাচল কেন বন্ধ হয়েছিল?
একসময় টেকনাফ থেকে প্রতিদিন ৯ থেকে ১১টি জাহাজে পাঁচ থেকে ছয় হাজার পর্যটক সেন্ট মার্টিনে যেতেন। নাফ নদী ও বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে পর্যটকেরা দ্বীপে পৌঁছাতেন।
তবে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের সংঘাত, আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা, নাফ নদীতে বাংলাদেশি ট্রলার ও যাত্রীবাহী নৌযান লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণ এবং নৌকাসহ বাংলাদেশিদের অপহরণের মতো ঘটনায় টেকনাফ-সেন্ট মার্টিন রুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রাখা হয়।
এ পরিস্থিতিতে পর্যটকদের যাতায়াতের জন্য বিকল্প ঘাট ও অনুমোদিত নৌযান পরিচালনার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বর্তমানে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নির্দেশনায় নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের কথা বলা হয়েছে।
সেন্ট মার্টিন ভ্রমণে যাওয়ার আগে যা জানা জরুরি
আগামী ১ নভেম্বর থেকে ভ্রমণ মৌসুম শুরু হলেও যাত্রার আগে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজের টিকিট, যাত্রার সময়সূচি, দৈনিক পর্যটকসীমা এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ফি সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সর্বশেষ নির্দেশনা অনুসরণ করা উচিত।
বিশেষ করে রাতযাপনের অনুমতি ও ভ্রমণের অন্যান্য শর্ত সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে হোটেল বা পর্যটনসেবা বুকিং না করাই ভালো। কারণ, পরিবেশগত সুরক্ষার স্বার্থে সেন্ট মার্টিনে পর্যটন কার্যক্রম নির্দিষ্ট নিয়মের অধীন পরিচালিত হবে।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি পর্যটকদের জন্য সুশৃঙ্খল ভ্রমণব্যবস্থা নিশ্চিত করাই এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। নির্ধারিত সীমার মধ্যে পর্যটক যাতায়াত পরিচালিত হলে দ্বীপটির পরিবেশের ওপর চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখার উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা সহজ হতে পারে।

