নতুন বেতনকাঠামো সরকারি কর্মচারীদের জন্য নিঃসন্দেহে স্বস্তির খবর। দীর্ঘদিনের উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং প্রকৃত আয় কমে যাওয়ার বাস্তবতায় বেতন সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে খুব বেশি মতভেদ নেই। তবে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতির দিক থেকে প্রশ্নটি ভিন্ন—এই বাড়তি ব্যয়ের চাপ সরকার কতটা সামলাতে পারবে?
নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নে বছরে অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৫৫ হাজার ৮০০ কোটি টাকা স্থায়ী ব্যয় হবে বলে হিসাব করা হচ্ছে। বড় প্রশ্ন হলো, এই অর্থ আসবে কোথা থেকে এবং শেষ পর্যন্ত এর বোঝা কে বহন করবে?
এটি এককালীন ব্যয় নয়। নতুন বেতন ও পেনশন কাঠামো চালু হলে প্রতিবছরের বাজেটেই এ ব্যয় বহন করতে হবে। ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন করলে শুরুতে চাপ কিছুটা কমতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি দায় কমবে না। কারণ বেতন ও পেনশন বাড়ানোর পর তা সহজে কমানোর সুযোগ থাকে না। রাজস্ব কমে গেলে উন্নয়ন প্রকল্প পিছিয়ে দেওয়া, কিছু কেনাকাটা স্থগিত করা কিংবা অন্যান্য ব্যয় কমানো সম্ভব হলেও বেতন কমানো প্রায় অসম্ভব।
ফলে ভবিষ্যতের বাজেট আরও অনমনীয় হয়ে উঠতে পারে। জ্বালানি সংকট, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ব্যাংক খাত সংস্কার, সামাজিক সুরক্ষা কিংবা নতুন অবকাঠামো বিনিয়োগের মতো খাতে জরুরি ভিত্তিতে অর্থ বরাদ্দের সক্ষমতা সরকারের কমে যেতে পারে।
অর্থের সংস্থানই প্রথম প্রশ্ন
এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হওয়া উচিত—বাড়তি ব্যয়ের অর্থের সংস্থান হবে কীভাবে। সবচেয়ে নিরাপদ পথ হলো রাজস্ব বাড়ানো। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের রাজস্ব আদায় দুর্বল। প্রতি বছর উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও অর্থবছর শেষে বড় ঘাটতি থেকে যায়।
এমন বাস্তবতায় বড় ধরনের স্থায়ী ব্যয় যুক্ত হলে আর্থিক চাপ আরও বাড়বে। তাই নতুন বেতনকাঠামো বাস্তবায়নের আগে করের আওতা বাড়ানো, কর ফাঁকি বন্ধ করা, অযৌক্তিক করছাড় কমানো, উচ্চ আয় ও সম্পদের ওপর কার্যকর কর নিশ্চিত করা এবং প্রযুক্তিনির্ভর রাজস্ব নজরদারি জোরদার করা জরুরি।
রাজস্ব সংস্কার ছাড়া বেতন-ভাতা বাড়ানোর সিদ্ধান্ত শেষ পর্যন্ত ঋণনির্ভরতা, অন্যান্য খাতে ব্যয় সংকোচন অথবা বড় বাজেট ঘাটতির দিকে নিয়ে যেতে পারে।
আরেকটি ঝুঁকি হলো, সরকারি রাজস্বের তুলনায় বাধ্যতামূলক ব্যয় যদি দ্রুত বাড়তে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সরকারের নীতিগত স্বাধীনতা সংকুচিত হবে। নতুন কোনো সংকট দেখা দিলে দ্রুত অর্থ বরাদ্দ করাও কঠিন হয়ে পড়বে। বেতন, পেনশন, সুদ ও ভর্তুকির মতো স্থায়ী ব্যয়ের চাপ ধীরে ধীরে বাজেটকে এমন একটি কাঠামোর মধ্যে আটকে ফেলতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্বল করবে।
সরকারি ও বেসরকারি খাতের বৈষম্যের ঝুঁকি
সরকারি কর্মচারীরা সংগঠিত, দৃশ্যমান এবং নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে প্রভাবশালী। বিপরীতে, বেসরকারি খাতের অধিকাংশ কর্মী সেই অবস্থানে নেই। তাঁদের বেতন নির্ভর করে প্রতিষ্ঠানের আয়, উৎপাদনশীলতা, মুনাফা, বাজার পরিস্থিতি ও প্রতিযোগিতার ওপর।
ফলে বড় সরকারি বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মিলিয়ে অনেক ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠান কর্মীদের বেতন বাড়াতে সক্ষম নাও হতে পারে। এতে সরকারি ও বেসরকারি খাতের আয়ের ব্যবধান আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
উন্নয়ন খাতের ব্যয় কমিয়ে বেতন বাড়ানোও সমাধান নয়
বেতন বাড়াতে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, জলবায়ু সহনশীলতা কিংবা উৎপাদনশীল অবকাঠামোর মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে বরাদ্দ কমানো আরও বড় সমস্যা তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশে এসব খাতে এমনিতেই ব্যয়ের ঘাটতি রয়েছে। রাষ্ট্র যদি সরকারি কর্মচারীদের বেশি বেতন দেয় কিন্তু স্কুল, হাসপাতাল, দক্ষতা উন্নয়ন, যোগাযোগব্যবস্থা কিংবা দুর্যোগ মোকাবিলায় কম ব্যয় করে, তাহলে একটি গোষ্ঠীর কল্যাণ বাড়লেও সামগ্রিক অর্থনীতির উৎপাদনশীলতা দুর্বল হতে পারে।
ব্যাংকঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও উদ্বেগের
নতুন বেতনকাঠামোর ব্যয় মেটাতে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে বড় অঙ্কের ঋণের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতাও ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারি খাতে ঋণ দেওয়া অনেক সময় ব্যাংকের কাছে বেসরকারি খাতে ঋণ দেওয়ার তুলনায় নিরাপদ মনে হতে পারে। এতে উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ঋণ পাওয়া কঠিন হতে পারে, সুদের হার উঁচু থাকতে পারে এবং বেসরকারি বিনিয়োগ দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
এখানেই মূল দ্বন্দ্বটি স্পষ্ট হয়। রাষ্ট্রীয় কর্মচারীদের আয় বাড়লেও সেই ব্যয় মেটাতে ব্যবসা ও উদ্যোক্তাদের ঋণের খরচ বেড়ে গেলে আজকের স্বস্তির বিনিময়ে আগামী দিনের বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তাই নতুন বেতনকাঠামোকে শুধু কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। এর সঙ্গে রাজস্ব সক্ষমতা, বাজেটের কাঠামো, সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার, ব্যাংকঋণ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

