চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে একটি খাল প্রশস্ত করতে পাশাপাশি থাকা দুটি ১০ তলা ভবন অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়েছে। ভবন দুটির আয়তন কাছাকাছি হলেও স্থাপনার মূল্যায়নে বড় ধরনের পার্থক্য দেখা দিয়েছে। একটি ভবনের স্থাপনা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা, অন্যটির ৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ দুই ভবনের মূল্যায়নের ব্যবধান ৯ কোটি ১৩ লাখ টাকার বেশি।
কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকায় হিজড়া খাল প্রশস্ত করতে কনকচাঁপা ও বাদশা নূরী নামে দুটি ভবন অপসারণ করতে হচ্ছে। ভবন দুটির স্থাপনা মূল্য নির্ধারণ করেছে চট্টগ্রাম গণপূর্ত বিভাগ। মূল্যায়নে এত বড় পার্থক্য নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ)। বিষয়টি পুনর্মূল্যায়নের জন্য গণপূর্ত বিভাগ ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে।
সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের পরিচালক ও নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনউদ্দীন বলেন, দুটি ভবনের মূল্যায়নে বড় ধরনের পার্থক্য রয়েছে। বিষয়টি গণপূর্ত বিভাগকে পুনর্মূল্যায়নের জন্য বলা হয়েছে এবং মন্ত্রণালয়কেও জানানো হয়েছে। বর্তমান নির্ধারিত দামে ক্ষতিপূরণ দিতে হলে প্রকল্পের বাজেটে ঘাটতি তৈরির আশঙ্কা রয়েছে।
একই এলাকায়, কাছাকাছি আয়তনের দুটি ভবন
নথি অনুযায়ী, কনকচাঁপা ভবনটি ২০১০ সালে নির্মিত। ভবনটিতে ২৪টি ফ্ল্যাট রয়েছে এবং মোট নির্মিত আয়তন ৫৪ হাজার ২৭৫ বর্গফুট। গণপূর্ত বিভাগ এ ভবনের স্থাপনা মূল্য নির্ধারণ করেছে ১৮ কোটি ৮০ লাখ টাকা।
অন্যদিকে পাশের বাদশা নূরী ভবনটি নির্মিত হয়েছে ২০১৩ সালে। অর্থাৎ এটি কনকচাঁপা ভবনের চেয়ে নতুন। ভবনটিতে রয়েছে ৩৬টি ফ্ল্যাট এবং মোট নির্মিত আয়তন ৫৮ হাজার ২০০ বর্গফুট—যা কনকচাঁপার চেয়ে বড়।
তবে বাদশা নূরী ভবনের স্থাপনা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা। দুই ভবনের স্থাপনা মূল্যের পার্থক্য দাঁড়িয়েছে ৯ কোটি ১৩ লাখ টাকার বেশি।
আইন অনুযায়ী, স্থাপনার নির্ধারিত মূল্যের দ্বিগুণ ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিধান রয়েছে। সে হিসাবে কনকচাঁপা ভবনের জন্য প্রায় ৩৭ কোটি ৬১ লাখ টাকা এবং বাদশা নূরী ভবনের জন্য প্রায় ১৯ কোটি ৩৪ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেওয়ার কথা। দুই ভবনের জন্য মোট ক্ষতিপূরণ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫৭ কোটি টাকা।
মূল্যায়ন পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন
সিডিএর মন্ত্রণালয়ে পাঠানো চিঠিতে দুটি ভবনের মূল্যায়নপদ্ধতিতে পার্থক্যের বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে।
কনকচাঁপা ভবনের ২৪টি ফ্ল্যাটের মূল্য পৃথকভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। একই ধরনের ফ্ল্যাটের ক্ষেত্রে কোথাও ৭৬ লাখ টাকা করে মূল্য ধরা হলেও কয়েকটি ফ্ল্যাটের মূল্য ৮৩ লাখ থেকে ১ কোটি ২৬ লাখ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
অন্যদিকে বাদশা নূরী ভবনের ৩৬টি ফ্ল্যাটের জন্য পৃথকভাবে মূল্য নির্ধারণ না করে পুরো ভবনের জন্য একসঙ্গে ৯ কোটি ৬৭ লাখ টাকা স্থাপনা মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
সিডিএর অভিযোগ, এই ভিন্ন পদ্ধতিও দুই ভবনের মূল্যায়নে বড় ব্যবধান তৈরির কারণ হতে পারে।
গণপূর্তের বক্তব্য
গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা অবশ্য মূল্যায়নে কোনো ভুল বা অনিয়মের কথা অস্বীকার করেছেন। তাঁদের বক্তব্য, ভবনমালিকের দেওয়া নকশা ও অন্যান্য তথ্যের ভিত্তিতে সরকারি রেট শিডিউল অনুসরণ করেই মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
গণপূর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, ভবনের মোট আয়তন, নির্মাণের বছর এবং নকশার মতো বিষয় বিবেচনায় নিয়ে স্থাপনার মূল্য নির্ধারণ করা হয়। ফলে দুই ভবনের মূল্য আলাদা হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।
তাঁদের দাবি, সিডিএ মূল্য নিয়ে আপত্তি জানানোর পর বিষয়টি আবার যাচাই করা হয়েছে। তবে মূল্য নির্ধারণে কোনো ভুল বা ত্রুটি পাওয়া যায়নি।
অস্তিত্বহীন সরঞ্জাম নিয়েও প্রশ্ন
কনকচাঁপা ভবনের বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের মূল্যায়ন নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে সিডিএ।
ভবনমালিকের দেওয়া তালিকা অনুযায়ী যৌথভাবে সরেজমিন পরিদর্শনের সময় কয়েকটি সরঞ্জামের সংখ্যা নিয়ে অসামঞ্জস্য পাওয়া যায়। তালিকায় চারটি সেন্ট্রিফিউগাল পাম্পের কথা থাকলেও পরিদর্শনে একটি পাওয়া যায়। ১৬টি সিসিটিভি ক্যামেরার মধ্যে ১৪টি পাওয়া যায়নি বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একইভাবে ২৫টি টেলিফোন সেটসহ পিএবিএক্স সিস্টেমের উল্লেখ থাকলেও সেগুলোও পাওয়া যায়নি।
সিডিএর প্রশ্ন, সরেজমিনে পাওয়া যায়নি এমন সরঞ্জামের মূল্য কীভাবে স্থাপনার মূল্যায়নের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত হলো। এ কারণে বৈদ্যুতিক সরঞ্জামের মূল্যও পুনর্নির্ধারণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
জলাবদ্ধতা প্রকল্পের বড় পরিধি
চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে মোট ৩৬টি খালের কাজ রয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ৮ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা।
কাতালগঞ্জ এলাকায় হিজড়া খালের বর্তমান প্রশস্ততা প্রায় ১২ ফুট। প্রকল্পের আওতায় এটি বাড়িয়ে ২৭ ফুট করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি খালের পাশে ১৫ ফুট প্রশস্ত সড়ক নির্মাণের পরিকল্পনাও রয়েছে। এ কারণে জমি অধিগ্রহণের পাশাপাশি দুটি ভবন অপসারণ করতে হচ্ছে।
সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, পুরো জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পে বিভিন্ন এলাকায় প্রায় ১ হাজার ৮০০ স্থাপনার জন্য ক্ষতিপূরণ দিতে হবে। উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবে এ জন্য মোট ১৬৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। কিন্তু হিজড়া খালের দুটি ভবনের জন্য বর্তমান নির্ধারিত মূল্য অনুযায়ীই প্রায় ৫৭ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণ প্রয়োজন হবে।
আগেও পুনর্মূল্যায়নে কমেছিল মূল্য
স্থাপনার মূল্যায়ন নিয়ে আগেও প্রশ্ন ওঠার উদাহরণ রয়েছে বলে জানিয়েছে সিডিএ।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, পাঁচলাইশ আবাসিক এলাকায় একটি একতলা ভবন ও সীমানাদেয়ালের মূল্য প্রথমে ৫৬ লাখ ৩১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। সিডিএ আপত্তি জানানোর পর পুনর্মূল্যায়নে সেই মূল্য কমে ৭ লাখ ৪৫ হাজার টাকা করা হয়। অর্থাৎ পুনর্মূল্যায়নের পর মূল্য কমেছিল প্রায় ৪৯ লাখ টাকা।
এ ঘটনার উদাহরণ টেনে হিজড়া খালের দুটি ভবনের মূল্য পুনর্মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তার কথা বলছে সিডিএ।
সিডিএ চেয়ারম্যান মো. বেলায়েত হোসেন জানিয়েছেন, প্রকল্প এলাকার ভবনের মূল্য গণপূর্ত বিভাগ নির্ধারণ করে এবং সেই অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। তাঁর মতে, একই ধরনের দুটি ভবনের মূল্যায়নে এত বড় ব্যবধান থাকলে বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে এবং গণপ

