প্রতিনিধি
ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন—এসআইআর—প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে ২ অক্টোবর দিল্লি ও মুম্বাইয়ে পৃথক কর্মসূচি পালন করেছে বিরোধী দল, ছাত্র ও তরুণদের বিভিন্ন সংগঠন। একই দাবিকে কেন্দ্র করে আয়োজিত দুই শহরের কর্মসূচিতে পুলিশের ভূমিকা ছিল একেবারেই ভিন্ন।
মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ডাকা সমাবেশে হাজারো মানুষ অংশ নেন। পুলিশ আগে কর্মসূচির অনুমতি না দিলেও শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের সংঘাত ছাড়াই সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। অন্যদিকে দিল্লিতে যন্তর মন্তরমুখী বিক্ষোভকারীদের আটকের পাশাপাশি বিভিন্ন সড়কে ব্যাপক ব্যারিকেড ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়। দিল্লি পুলিশের হিসাবে, বিক্ষোভ ঘিরে অন্তত ১ হাজার ১০০ জনকে আটক করা হয়েছে।
মুম্বাইয়ে বড় সমাবেশ
গান্ধীজয়ন্তীর দিন মুম্বাইয়ের শিবাজি পার্কে ‘জেল ভরো আন্দোলন’ কর্মসূচির ডাক দেয় সিজেপি। দলটির নেতা অভিজিৎ দিপকের নেতৃত্বে আয়োজিত এই কর্মসূচিতে বিপুলসংখ্যক মানুষ জড়ো হন। মুম্বাই পুলিশের স্পেশাল ব্রাঞ্চের হিসাবে বিকেল ৪টার দিকে সমাবেশে উপস্থিতির সংখ্যা প্রায় ৯ থেকে ১০ হাজারে পৌঁছেছিল বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
সমাবেশে চলচ্চিত্র ব্যক্তিত্ব নাসিরুদ্দিন শাহ, শাবানা আজমি, বিশাল দাদলানি ও বিশাল ভরদ্বাজসহ বেশ কয়েকজন সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত মুখ উপস্থিত ছিলেন। সমাজকর্মী তুষার গান্ধীও কর্মসূচিতে অংশ নেন।
অভিজিৎ দিপকে সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর প্রক্রিয়া বাতিলের দাবি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি জানান, তাঁদের আন্দোলন শান্তিপূর্ণ থাকবে। একই সঙ্গে জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেন তিনি।
দিল্লিতে ব্যাপক আটক
এদিকে দিল্লিতে একই দাবিতে বিভিন্ন বিরোধী দল, ছাত্র ও নাগরিক সংগঠনের কর্মীরা যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টা করেন। পুলিশ আগে থেকেই ব্যারিকেড বসিয়ে বিভিন্ন সড়কে নিরাপত্তা জোরদার করে। বিক্ষোভকারীদের একটি অংশকে বাসে করে বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
দিল্লি পুলিশের হিসাবে অন্তত ১ হাজার ১০০ জনকে আটক করা হয়। বিক্ষোভে বিরোধী দলগুলোর নেতা, ছাত্র সংগঠনের কর্মী এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও ছিলেন।
দিল্লির এই পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন সিজেপি নেতাসহ বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক নেতা। তাঁদের বক্তব্য, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভের অধিকারকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। অন্যদিকে, পুলিশের অবস্থান ছিল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখার প্রয়োজনীয়তার ওপর।
একই দাবিতে দুই শহরে দুই ধরনের অভিজ্ঞতা
মুম্বাই ও দিল্লির কর্মসূচিকে ঘিরে পুলিশের ভূমিকার এই পার্থক্য রাজনৈতিক মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মহারাষ্ট্রে বিজেপি নেতৃত্বাধীন সরকার থাকলেও মুম্বাইয়ের কর্মসূচিতে পুলিশ শেষ পর্যন্ত ব্যাপক সংঘাতমূলক পদক্ষেপ নেয়নি। অন্যদিকে দিল্লিতে বিক্ষোভকারীদের আটকের ঘটনা ছিল ব্যাপক। একটি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মহারাষ্ট্র সরকার পরিস্থিতিকে সংঘাতমুক্ত রাখার কৌশল নিয়েছিল।
তবে দুই শহরের পরিস্থিতি এক ছিল না—মুম্বাইয়ে সিজেপির নিজস্ব কর্মসূচি ছিল শিবাজি পার্ককে কেন্দ্র করে, আর দিল্লিতে একাধিক বিরোধী ও ছাত্র সংগঠনের কর্মসূচি যন্তর মন্তরকেন্দ্রিক ছিল। ফলে পুলিশের সিদ্ধান্তের পেছনে স্থানীয় প্রশাসনিক ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিও একটি বিষয় ছিল।
এসআইআর নিয়ে আইনি পর্যালোচনা
এদিকে এসআইআর নিয়ে সাবেক বিচারপতি ও আইনজীবীদের সংগঠন ‘ল’য়ার্স অ্যাসোসিয়েশন ফর কনস্টিটিউশন’ (এলএএফসি) একটি পৃথক উদ্যোগ নিয়েছে। সংগঠনটি এসআইআরের যৌক্তিকতা, সাংবিধানিক বৈধতা, প্রক্রিয়া এবং এর সম্ভাব্য প্রভাব পর্যালোচনার জন্য পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠনের কথা জানিয়েছে।
কমিটির নেতৃত্বে রয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি মদন বি. লোকুর। সদস্য হিসেবে রয়েছেন সাবেক বিচারপতি এ কে পট্টনায়েক, সাবেক প্রধান বিচারপতি বদর দুরেজ আহমেদ এবং সাবেক বিচারপতি রেখা শর্মা ও অঞ্জনা প্রকাশ। কয়েকজন বিশিষ্ট আইনজীবী কমিটিকে আইনি পরামর্শ দেবেন।
এদিকে দিল্লি ও মুম্বাইয়ের কর্মসূচির পরও আন্দোলন অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে সিজেপি। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সিইসি পদত্যাগ না করলে ১০ অক্টোবর দিল্লিতে ফের কর্মসূচি নেওয়া হবে।

