বাংলাদেশের তৈরি পোশাকশিল্পে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য অতিরিক্ত গরম এখন শুধু সাময়িক সমস্যা নয়, বরং কর্মপরিবেশের একটি বড় ঝুঁকি হয়ে উঠছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রায় কাজ করার কারণে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য ও কর্মদক্ষতা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। একই সঙ্গে এর প্রভাব পড়ছে উৎপাদন ও অর্থনীতিতেও।
কর্নেল ইউনিভার্সিটির গ্লোবাল লেবার ইনস্টিটিউটের গবেষণায় বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে ঢাকায় প্রায় সাত মাস ধরে তাপজনিত চাপের পরিস্থিতি ছিল। গবেষণাটি এটিকে নতুন স্বাভাবিক পরিস্থিতি হিসেবে উল্লেখ করেছে। গত দুই দশকে বিভিন্ন পোশাক উৎপাদনকেন্দ্রের মধ্যে ২৩টির ১৭টিতে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রার দিনের গড় সংখ্যা ১০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে।
গরমে কমছে কর্মঘণ্টা ও উৎপাদনশীলতা
চরম গরমের প্রভাব ইতোমধ্যে পোশাক কারখানাগুলোতে দেখা যাচ্ছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা একটি গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের আটটি পোশাক কারখানায় তাপজনিত চাপের কারণে গড়ে ৪ দশমিক ১ শতাংশ কর্মসময় নষ্ট হয়েছে।
ক্লাইমেট রাইটস ইন্টারন্যাশনাল (CRI), আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা—আইএলওর হিসাবের উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, ২০২০ সালে বাংলাদেশের প্রায় ৭ কোটি শ্রমিক কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত তাপের মুখোমুখি হয়েছিলেন। ২০ বছরে এই সংখ্যা ৫১ শতাংশ বেড়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে মোট কর্মঘণ্টার ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ হারানোর আশঙ্কা রয়েছে। এই ক্ষতি প্রায় ৩৮ লাখ পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আইএলওর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালে বিশ্বজুড়ে অতিরিক্ত কর্মক্ষেত্রের তাপের সঙ্গে ১৮ হাজার ৯৭০টি মৃত্যু এবং প্রায় ২ কোটি ২৯ লাখ আঘাতের ঘটনা সম্পর্কিত ছিল।
তাপ মোকাবিলায় নতুন নির্দেশিকা
এ পরিস্থিতিতে আমেরিকান অ্যাপারেল অ্যান্ড ফুটওয়্যার অ্যাসোসিয়েশন (AAFA) প্রকাশিত তাপজনিত চাপ মোকাবিলার নতুন টুলকিটকে গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
টুলকিটে কারখানাগুলোতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রার সীমা নির্ধারণ, আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী কাজের চাপ ও বিরতির সময় পরিবর্তন এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।
এর পাশাপাশি কর্মীদের কর্মপরিবেশ নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় ব্যয়ের একটি অংশ ব্র্যান্ড ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে যৌথভাবে বহন করার বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতে উচ্চ তাপমাত্রাজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে আনুমানিক ২৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার প্রয়োজন হতে পারে। ২০২৫ সালের পোশাক রপ্তানি আয়ের তুলনায় এই ব্যয় প্রায় শূন্য দশমিক ২ শতাংশ।
শুধু কারখানার নয়, ক্রেতাদেরও দায়িত্ব
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিছু কারখানা তাদের বিদেশি ক্রেতাদের কাছ থেকে তাপ মোকাবিলা সংক্রান্ত নির্দেশনা পেলেও শিল্পসংশ্লিষ্ট সবাই এখনো এ উদ্যোগ সম্পর্কে সমানভাবে অবগত নন।
বাংলাদেশ অ্যাপারেল ওয়ার্কার্স ফেডারেশনের সভাপতি জানিয়েছেন, তিনি AAFA-এর নতুন টুলকিট সম্পর্কে অবগত নন। অন্যদিকে বিজিএমইএর সভাপতি বলেছেন, AAFA থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক নির্দেশনা তাদের কাছে আসেনি, যদিও কিছু কারখানা ক্রেতাদের কাছ থেকে নির্দেশনা পেয়েছে।
এ অবস্থায় তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় দায়িত্ব ভাগাভাগির পাশাপাশি ব্যয়ের দায়ও ভাগাভাগি করা জরুরি। যেসব আন্তর্জাতিক ক্রেতা কারখানাগুলোকে নতুন নিরাপত্তা নির্দেশনা দিচ্ছেন, সেসব ব্যবস্থার অতিরিক্ত ব্যয় যেন শুধু সরবরাহকারীদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া না হয়—এমন মত তুলে ধরা হয়েছে প্রতিবেদনে।
সরকারের নীতিমালার প্রয়োজন
কর্মক্ষেত্রে তাপমাত্রার নিরাপদ সীমা নির্ধারণ এবং তা কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য সরকারেরও উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বেশি ঝুঁকিতে থাকা শ্রমিকদের জন্য খাতভিত্তিক অভিযোজন তহবিল গঠনের কথাও প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
বিজিএমইএ, বিদেশি ব্র্যান্ড, শ্রমিক সংগঠন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বিত একটি কাঠামো তৈরি হলে তাপজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলা করা সহজ হতে পারে। এ প্রক্রিয়ায় শ্রমিকদের মতামত ও অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাও গুরুত্বপূর্ণ।
চরম তাপের কারণে শ্রমিকদের স্বাস্থ্য, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের ওপর যে চাপ তৈরি হচ্ছে, তা সময়ের সঙ্গে আরও বাড়তে পারে। তাই তৈরি পোশাকশিল্পে তাপ মোকাবিলাকে শুধু শ্রমিক কল্যাণের বিষয় হিসেবে নয়, উৎপাদন ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার অংশ হিসেবেও দেখা প্রয়োজন।

