বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আসন্ন জাপান সফরকে ঘিরে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও জোরদার হওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে টোকিও। জাপানের প্রত্যাশা, এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব নতুন গতি পাবে এবং বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগের নতুন সুযোগ তৈরি হবে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির আমন্ত্রণে আগামী ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবর জাপান সফর করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরের দ্বিতীয় দিন ২৭ অক্টোবর টোকিওতে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর উচ্চপর্যায়ের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ও সফরের সময়সূচি নিশ্চিত করেছে।
বিনিয়োগ ও বাণিজ্যে গুরুত্ব
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম জাপান সফরকে স্বাগত জানিয়েছে ঢাকায় অবস্থিত জাপান দূতাবাসের অর্থনৈতিক বিভাগ। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থাকে (বাসস) দেওয়া এক প্রতিক্রিয়ায় তারা জানিয়েছে, এ সফরের মাধ্যমে দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব আরও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
জাপানের মতে, বাংলাদেশের নতুন সরকারের ব্যবসাবান্ধব নীতি বিনিয়োগকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে সহায়ক হতে পারে। পাশাপাশি বিনিয়োগ পরিবেশের উন্নয়ন, অবকাঠামো খাতে সহযোগিতা সম্প্রসারণ এবং মানবসম্পদ ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বাড়ানোর বিষয়গুলোও গুরুত্ব পাবে।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী জাপান-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ফোরামে মূল বক্তব্য দেবেন। এ ছাড়া জাপানের ব্যবসায়ী নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বিনিয়োগের সুযোগ, বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং শিল্প খাতে সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা করবেন।
একাধিক সমঝোতা স্মারক সইয়ের সম্ভাবনা
প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে দুই দেশের মধ্যে একাধিক সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সইয়ের প্রস্তুতি চলছে। বাসসের ২৩ অক্টোবরের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় আটটি সহযোগিতার নথি নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে শেষ পর্যন্ত কতটি নথিতে সই হবে, তা আলোচনা চূড়ান্ত হওয়ার ওপর নির্ভর করবে।
সম্ভাব্য সহযোগিতার ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, বেসামরিক বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়ন।
এ ছাড়া জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ এবং জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠকের সম্ভাব্য কর্মসূচিও রয়েছে।
জাইকা, জেট্রো ও জেবিআইসির সঙ্গে বৈঠক
সফরকালে জাপানের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সংস্থার শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করার পরিকল্পনা রয়েছে প্রধানমন্ত্রীর। এসব সংস্থার মধ্যে রয়েছে জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সি (জাইকা), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন (জেবিআইসি)।
এসব বৈঠকে বাংলাদেশের উন্নয়ন প্রকল্প, নতুন বিনিয়োগ, শিল্পায়ন এবং বাণিজ্যিক সহযোগিতার সুযোগ নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর সম্ভাব্য কর্মসূচিতে জাপানের চিবা প্রিফেকচারের ফুতসু শহরের একটি তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র পরিদর্শনের পাশাপাশি ইউনিক্লোর সদর দপ্তর এবং নাগোয়া শহরে টয়োটার একটি কারখানা পরিদর্শনও রয়েছে।
বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তির বাস্তবায়ন
দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। ২০২৬ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি দুই দেশ চুক্তিটিতে সই করে। চুক্তির লক্ষ্য পণ্য ও সেবার বাজারে প্রবেশাধিকার বাড়ানো এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের নিয়মকানুন আরও সুসংহত করা।
প্রধানমন্ত্রীর সফরে চুক্তিটির কার্যকর বাস্তবায়ন, জাপানের বাজারে বাংলাদেশের পণ্যের প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বাড়ানোর উপায় নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে।
বাংলাদেশের জন্য জাপানের বাজারে রপ্তানি বাড়ানোর পাশাপাশি নতুন শিল্প বিনিয়োগ আকর্ষণ, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং স্থানীয় কর্মসংস্থান সৃষ্টির সুযোগ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য।
কর্মসংস্থান ও মানবসম্পদ উন্নয়নে সহযোগিতা
বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার বিষয়ে জাপানের সঙ্গে সহযোগিতা বাড়াতে চায় সরকার। এ ক্ষেত্রে কারিগরি দক্ষতা, প্রশিক্ষণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা উন্নয়নের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে।
বাংলাদেশের উন্নয়ন সহযোগীদের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরেই অন্যতম প্রধান অংশীদার জাপান। ঢাকার মেট্রোরেল, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ী এলাকার অবকাঠামো উন্নয়ন জাপানের সহযোগিতায় বাস্তবায়িত গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে।
আসন্ন সফরে চলমান প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যতের উন্নয়ন উদ্যোগে সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় আসতে পারে।
আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও রোহিঙ্গা সংকট
অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়েও দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই ও শান্তিপূর্ণ সমাধান এবং জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়গুলোও আলোচনার অংশ হতে পারে।
জাপানের প্রত্যাশা, উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে নেওয়া সিদ্ধান্ত ও অঙ্গীকারগুলো বাস্তবায়নের মাধ্যমে দুই দেশের ব্যবসায়িক আস্থা বাড়বে এবং নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হবে।
অর্থনৈতিক সম্পর্কের নতুন সম্ভাবনা
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চার দিনের জাপান সফর দুই দেশের কৌশলগত অংশীদারত্বকে আরও এগিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে। বিনিয়োগ, বাণিজ্য, অবকাঠামো উন্নয়ন, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং মানবসম্পদ উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতা বাড়াতে পারলে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে ইতিবাচক ভূমিকা রাখার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে সফরের বাস্তব সুফল নির্ভর করবে আলোচনায় গৃহীত সিদ্ধান্ত, চুক্তি ও সমঝোতাগুলোর কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর।

