বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রতিদিন কত মানুষ আক্রান্ত হচ্ছেন, সেই প্রশ্নও সামনে আসছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর (DGHS) নিয়মিত বুলেটিনে নতুন রোগী, হাসপাতালে ভর্তি, সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পাওয়া এবং মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করছে। তবে এসব পরিসংখ্যান কি দেশে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত সব মানুষের প্রকৃত সংখ্যা তুলে ধরে?
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২৭ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় দেশে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ২ হাজার ১৫৮ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন এবং ছয়জনের মৃত্যু হয়েছে। চলতি বছরে এ পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩ হাজার ৬৯৪ জন এবং মৃতের সংখ্যা ২২৫।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের প্রকাশিত সংখ্যা মূলত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে শনাক্ত ও রিপোর্ট হওয়া রোগীর হিসাব। ফলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলেও যারা হাসপাতালে ভর্তি হননি, চিকিৎসা নিয়েছেন বাড়িতে বা বেসরকারি ব্যবস্থায়, কিংবা কোনো কারণে রিপোর্টিং ব্যবস্থার আওতায় আসেননি—তাদের সবাই সরকারি মোট সংখ্যায় যুক্ত নাও হতে পারেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও বলছে, ডেঙ্গুর বিপুলসংখ্যক রোগীর উপসর্গ হালকা বা উপসর্গহীন হতে পারে এবং অনেকেই নিজেরাই চিকিৎসা নেন। এ কারণে প্রকৃত আক্রান্তের সংখ্যা সরকারি রিপোর্টের চেয়ে বেশি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। স্বাস্থ্য নজরদারি ও রিপোর্টিং ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও মোট আক্রান্তের সংখ্যা নির্ধারণকে কঠিন করে।
বাংলাদেশে ডেঙ্গু নজরদারিতে হাসপাতালভিত্তিক তথ্যের গুরুত্বও রয়েছে। WHO-এর বাংলাদেশসংক্রান্ত প্রতিবেদনে অতীতে DGHS-এর হাসপাতালভিত্তিক নজরদারি ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট হাসপাতাল ও জেলা-উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে।
তাই ‘দেশে মোট ডেঙ্গু রোগী কত’ এবং ‘স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে কতজন রোগী শনাক্ত বা হাসপাতালে ভর্তি’—এই দুই প্রশ্নের উত্তর এক নয়। সরকারি পরিসংখ্যান রোগের প্রবণতা, হাসপাতালে চাপ ও মৃত্যুর পরিস্থিতি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটিকে দেশের প্রতিটি আক্রান্ত ব্যক্তির পূর্ণ গণনা হিসেবে দেখা ঠিক হবে না।
চলতি বছরের পরিস্থিতিও উদ্বেগের। ২৭ সেপ্টেম্বরের ২৪ ঘণ্টায় ২ হাজার ১৫৮ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য দিয়েছে DGHS, যা এ বছরের এক দিনে সর্বোচ্চ বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই দিন পর্যন্ত চলতি বছরের মোট মৃত্যু ২২৫ এবং রিপোর্ট হওয়া আক্রান্তের সংখ্যা ৭৩ হাজার ৬৯৪।
ডেঙ্গুর প্রকৃত চিত্র বুঝতে শুধু মোট রোগীর সংখ্যা নয়, কোন এলাকায় কত রোগী শনাক্ত হচ্ছে, হাসপাতালে ভর্তি ও মৃত্যুর হার কত, বেসরকারি চিকিৎসা ও পরীক্ষার মাধ্যমে কত রোগী ধরা পড়ছে এবং কমিউনিটি পর্যায়ে রোগের বিস্তার কেমন—এসব তথ্যও গুরুত্বপূর্ণ।
ফলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবকে অবিশ্বস্ত বলার চেয়ে এটিকে রিপোর্ট হওয়া ও স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থায় শনাক্ত রোগীর সরকারি পরিসংখ্যান হিসেবে দেখা বেশি যৌক্তিক। একই সঙ্গে ডেঙ্গুর প্রকৃত বিস্তার বোঝার জন্য নজরদারি আরও বিস্তৃত ও তথ্য সংগ্রহের পদ্ধতি আরও স্বচ্ছ করা গুরুত্বপূর্ণ।

