নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশের চলমান গ্যাস ও জ্বালানি সংকট নিয়ে জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হয়েছে। সরকারি দলের সদস্যরা সংকটের জন্য আগের আওয়ামী লীগ সরকারের নীতি, দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনাকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে বিরোধী দলের সদস্যরা বর্তমান সরকারের ব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্তহীনতা ও নেতৃত্বের ঘাটতিকেও সংকটের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
সোমবার জ্বালানি সংকট নিয়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানের উত্থাপিত একটি প্রস্তাবের ওপর সংসদে এ আলোচনা হয়। তিনি বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের বিঘ্ন, শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে বেকারত্ব বাড়া এবং জাতীয় অর্থনীতিতে ক্ষতি ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান।
শফিকুর রহমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় একটি স্থায়ী টাস্কফোর্স বা বিশেষ সেল গঠনের প্রস্তাব দেন। তাঁর মতে, এটি সাময়িক উদ্যোগ না হয়ে সরকার ও বিরোধী দলের সমন্বিতভাবে কাজ করার একটি স্থায়ী কাঠামো হওয়া উচিত। এতে সংকট মোকাবিলায় জনআস্থা বাড়বে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
সংকটের কারণ নিয়ে ভিন্নমত
জামায়াতের সংসদ সদস্য মুহাম্মদ নজিবুর রহমান বলেন, বর্তমান সংকটের মূল কারণ দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, সিদ্ধান্তহীনতা এবং সরকারের দুর্বল নেতৃত্ব। তিনি দেশীয় গ্যাস উৎপাদন বাড়ানো, নিয়মিত জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, বিদ্যমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোর পূর্ণ ব্যবহার এবং মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ওপর জোর দেন।
তিনি আরও দেশীয় কয়লা ব্যবহারের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখতে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দেন। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন, সার উৎপাদন ও রপ্তানিমুখী শিল্পের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে গ্যাস সরবরাহকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন।
অন্যদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ দাবি করেন, আগের সরকারের সময় একক উৎসনির্ভর গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে বিদেশিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থা তৈরি করা হয়েছিল। তাঁর অভিযোগ, এতে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠী সুবিধা পেয়েছে।
পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিও আগের সরকারের জ্বালানি নীতির সমালোচনা করেন। তাঁর বক্তব্য, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলনের পরিবর্তে আমদানিনির্ভর নীতি নেওয়া হয়েছিল।
২০২৭-২৮ সালে স্বস্তি, ২০৩০ সালে সংকটমুক্তির লক্ষ্য
জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী আনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট মোকাবিলায় স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। সরকারের লক্ষ্য হলো ২০২৭ সালে কিছুটা স্বস্তি, ২০২৮ সালে আরও বেশি স্বস্তি এবং ২০৩০ সালের মধ্যে জ্বালানি সংকটমুক্ত পরিস্থিতি তৈরি করা।
তিনি জানান, দেশের স্থল ও সমুদ্রাঞ্চলে গ্যাস অনুসন্ধান কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ১৫০টি গ্যাসকূপ খননের পরিকল্পনার মধ্যে ৩০টির কাজ ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। এসব কূপ থেকে ২০৩১ সালের মধ্যে জাতীয় গ্রিডে দৈনিক ২ হাজার ৩২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস যুক্ত হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) কিনতে অতিরিক্ত প্রায় ১৫ হাজার ৩৫০ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে বলেও জানান প্রতিমন্ত্রী।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় দেশীয় গ্যাস, কয়লা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পারমাণবিক শক্তির সমন্বয়ে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি কাঠামো গড়ে তোলার প্রস্তাবও আলোচনায় এসেছে।

