পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন চরকারফারমায় স্কুলে যেতে প্রতিদিন পাঁচটি খাল সাঁতরাতে হয় শিশুদের। এতে ভিজে যায় বই-খাতা ও ইউনিফর্ম। বৃষ্টি ও জোয়ারের সময় দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়।
পটুয়াখালীর গলাচিপা উপজেলার চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের প্রতিদিনই এমন ঝুঁকি নিয়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে। চরটির দক্ষিণ প্রান্তে ম্যানগ্রোভ বনের পাশে বসবাসকারী দ্বিতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী মো. জহিরুল ইসলামসহ আরও কয়েকজন শিশু প্রতিদিন পাঁচটি খাল সাঁতরে বিদ্যালয়ে পৌঁছায়।
শিক্ষার্থীরা জানায়, খালের পানি পেরিয়ে স্কুলে যাওয়ার সময় বই-খাতা ও পোশাক ভিজে যায়। শরীরও ভেজা থাকে দীর্ঘ সময়। বৃষ্টির দিনে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে পড়ে। ভিজে গিয়ে অসুস্থ হলে অনেক সময় কয়েক দিন স্কুলে যাওয়া সম্ভব হয় না।
চরকারফারমায় প্রায় ৮০টি জেলে ও কৃষক পরিবার বসবাস করে। এসব পরিবারের শিশুদের শিক্ষার সুযোগ করে দিতে ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় চরকারফারমা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। বর্তমানে বিদ্যালয়ে ৫১ জন শিক্ষার্থী—২৬ জন ছাত্র ও ২৫ জন ছাত্রী। তাদের জন্য শিক্ষক রয়েছেন মাত্র তিনজন।
বিদ্যালয়টিতে যাতায়াতের জন্য নেই কোনো সড়ক, নৌযান বা বিকল্প ব্যবস্থা। স্থানীয়দের একটি নৌকা থাকলেও সেটি মাছ ধরার কাজে ব্যবহার করা হয়। ফলে শিশুদের অনেকটা বাধ্য হয়েই খাল সাঁতরে বিদ্যালয়ে যেতে হয়।
চরকারফারমার ভৌগোলিক অবস্থানও যোগাযোগ সমস্যাকে আরও জটিল করেছে। দক্ষিণে ম্যানগ্রোভ বন ও বঙ্গোপসাগর, পশ্চিমে রাবনাবাদ নদী, পূর্বে তেঁতুলিয়া নদী এবং উত্তরে আগুনমুখা মোহনা। চারদিকে নদী ও মোহনায় বিচ্ছিন্ন এই চরে এখনো কোনো সড়ক যোগাযোগ গড়ে ওঠেনি।
গলাচিপা শহর থেকে প্রায় আট কিলোমিটার দক্ষিণে বোয়ালিয়া স্লুইসগেটে যেতে হয়। সেখান থেকে প্রায় আধা কিলোমিটার হেঁটে আগুনমুখার তীরে খেয়াঘাটে পৌঁছাতে হয়। এরপর খেয়া পার হয়ে কারফারমা দ্বীপে যেতে হয়। আগুনমুখা পেরিয়ে দ্বীপে পৌঁছানোর পরও বিদ্যালয়ে যেতে শিক্ষার্থীদের আরও কয়েকটি খাল অতিক্রম করতে হয়।
বর্ষাকালে দুর্ভোগ আরও বাড়ে। দ্বীপটিতে বেড়িবাঁধ না থাকায় বছরের বড় একটি সময় জোয়ারের পানিতে স্কুল মাঠ ও আশপাশের রাস্তাঘাট ডুবে থাকে। এতে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত বিদ্যালয়ে যাতায়াত ব্যাহত হয় এবং উপস্থিতিও কমে যায়।
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. নেছার উদ্দিন বলেন, রাস্তাঘাট না থাকায় শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের অনেক দুর্ভোগ পোহাতে হয়। শিক্ষকরা খেয়া বা স্থানীয় জেলেদের নৌকায় যাতায়াত করতে পারলেও শিক্ষার্থীদের খাল সাঁতরে স্কুলে আসতে হয়। রাস্তাঘাট তৈরি হলে বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বাড়বে বলে তিনি মনে করেন।
বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি শাহিদা বেগম জানান, চরটিতে প্রায় ৮০টি পরিবার বসবাস করে। বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য তিনি জায়গা দিয়েছিলেন। তবে স্থানীয় মানুষের নিজস্ব উদ্যোগে রাস্তা নির্মাণের সামর্থ্য নেই। শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের জন্য হলেও প্রয়োজনীয় রাস্তাঘাট নির্মাণের দাবি জানান তিনি।
সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. জাহাঙ্গীর হোসেন টুটু বলেন, বিদ্যালয়ে যাওয়ার রাস্তা নেই—বিষয়টি সত্য। বর্তমানে এ কাজের জন্য কোনো বরাদ্দ নেই। বরাদ্দ পাওয়া গেলে রাস্তা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. গোলাম সগীর বলেন, রাস্তা না থাকার কারণে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী কমে গেছে। বিষয়টি দুঃখজনক। বিদ্যালয়ে যাওয়ার রাস্তা না থাকার বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আবুজর মো. ইজাজুল হক জানান, বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। স্থানটি পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
চরকারফারমার শিশুদের শিক্ষা নিশ্চিত করতে নিরাপদ ও সারা বছর ব্যবহারযোগ্য যাতায়াতব্যবস্থা এখন সবচেয়ে জরুরি। স্কুলে পৌঁছাতে শিশুদের প্রতিদিন খাল সাঁতরানোর মতো ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি থেকে বের করে আনতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ প্রয়োজন।

