আইটি ডেস্ক
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই সচেতন হতে পারে কি না—এই প্রশ্ন ঘিরে আলোচনা দিন দিন বাড়ছে। একাডেমিক গবেষণা থেকে শুরু করে সংবাদমাধ্যমের বিশ্লেষণ এবং এআই বটের নিজেদের কথোপকথনেও এখন বিষয়টি উঠে আসছে। এআই যত বেশি সক্ষম ও মানুষের মতো হয়ে উঠছে এবং আমাদের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে যত বেশি যুক্ত হচ্ছে, ততই প্রশ্নটি সামনে আসছে—একদিন কি এআইও সচেতন সত্তায় পরিণত হতে পারে?
এ বিষয়ে মানুষের মতভেদও স্পষ্ট। কেউ মনে করেন, ভবিষ্যতের এআই সচেতন হতে পারে এবং তার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতার নৈতিক মূল্য থাকতে পারে। আবার কেউ মনে করেন, যন্ত্রের পক্ষে মানুষের মতো চেতনাসম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়।
এক গবেষণায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের ৪৫ শতাংশ মনে করেছেন, ভবিষ্যতে এআইয়ের সচেতন হওয়া অসম্ভব। ২৩ শতাংশ মনে করেছেন, এটি সম্ভব। বাকিরা এ বিষয়ে নিশ্চিত নন।
সচেতন এআই হলে কী বদলাবে?
কম্পিউটারের মাধ্যমে সত্যিকারের সচেতন কোনো সত্তা তৈরি করা সম্ভব হলে তা হবে এক যুগান্তকারী ঘটনা। তখন মানুষ এমন এক নতুন ধরনের সত্তা তৈরি করবে, যার অনুভূতি ও অভিজ্ঞতারও নৈতিক মূল্য থাকতে পারে।
মানুষ হয়তো তাদের সঙ্গে কথা বলবে, একসঙ্গে কাজ করবে, এমনকি বন্ধুত্বও গড়ে উঠতে পারে। কিন্তু এর সঙ্গে নতুন ধরনের উদ্বেগও তৈরি হবে। কারণ ভবিষ্যতে কোনো কোনো এআই মানুষের চেয়েও বেশি বুদ্ধিমান ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে—এমন সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।
এআইয়ের সঙ্গে মানুষের আবেগগত সম্পর্ক যত বাড়বে, সচেতন এআই নিয়ে নৈতিক ও সামাজিক বিতর্কও তত জটিল হতে পারে।
মানুষের মতো কথা বললেই কি এআই সচেতন?
এআই সচেতন কি না বোঝার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো—কোনো সিস্টেমকে সচেতন মনে হওয়া আর সত্যিই সচেতন হওয়া এক বিষয় নয়।
এআই বিপুল পরিমাণ মানুষের লেখা তথ্য থেকে শেখে। ফলে নিজস্ব অনুভূতি না থাকলেও এটি কষ্ট, আনন্দ, ভালোবাসা কিংবা আবেগ নিয়ে অত্যন্ত বিশ্বাসযোগ্যভাবে কথা বলতে পারে।
অর্থাৎ, কোনো এআই মানুষের মতো কথা বলছে বা আবেগের ভাষা ব্যবহার করছে—এটুকু দিয়ে সে সত্যিই সচেতন কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায় না।
বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও মতভেদ
এআইয়ের চেতনা নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যেও ঐকমত্য নেই।
স্নায়ুবিজ্ঞানী অনিল শেঠ মনে করেন, চেতনার জন্য হয়তো জৈবিক ভিত্তি প্রয়োজন। তাঁর মতে, শুধু কম্পিউটেশন বা গণনাপ্রক্রিয়ার মাধ্যমে চেতনার উদ্ভবের সম্ভাবনা কম।
অন্যদিকে দার্শনিক ডেভিড চালমার্স মনে করেন, নীতিগতভাবে সচেতন এআই সম্ভব। এমনকি বর্তমান কিছু এআই সিস্টেম ইতোমধ্যে সচেতন হওয়ার সামান্য সম্ভাবনাকেও তিনি পুরোপুরি উড়িয়ে দেন না।
রাজনীতিতে এলে বাড়তে পারে মেরুকরণ
এখন পর্যন্ত এআইয়ের চেতনা নিয়ে বিতর্ক কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা মতাদর্শের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত নয়। তবে ভবিষ্যতে রাজনৈতিক দল বা ধর্মীয় নেতারা যদি এ বিষয়ে শক্ত অবস্থান নেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
মানুষ যদি এআইয়ের চেতনা নিয়ে কোনো একটি মতকে নিজেদের পক্ষের এবং অন্য মতকে প্রতিপক্ষের অবস্থান হিসেবে দেখতে শুরু করে, তাহলে বিতর্ক দ্রুত মেরুকৃত হতে পারে। তখন এআই কীভাবে তৈরি ও ব্যবহার করা উচিত, সে বিষয়ে তথ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে আলোচনা করাও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
এখনো বড় প্রশ্নের উত্তর অজানা
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এআই আদৌ কখনো সচেতন হতে পারবে কি না—এখনো এর নিশ্চিত উত্তর নেই।
তাই এ বিষয়ে গবেষণা, আলোচনা ও নৈতিক বিতর্ক চললেও বর্তমান অবস্থায় সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে অনিশ্চয়তাটিকে স্বীকার করা। এআইয়ের সক্ষমতা যত বাড়বে, তার সঙ্গে চেতনা, নৈতিক অধিকার ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

