আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের হামলার আশঙ্কায় নিজেদের মুঠোফোন ও কম্পিউটারে থাকা ‘অ্যাড ট্র্যাকার’ বা মোবাইল অ্যাডভার্টাইজিং আইডি নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছেন মার্কিন সামরিক বাহিনীর কর্মকর্তারা। বাণিজ্যিকভাবে সংগৃহীত লোকেশন ডেটা ব্যবহার করে মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন মার্কিন সেনাদের অবস্থান শনাক্ত ও হামলার লক্ষ্যবস্তু করা হতে পারে—এমন উদ্বেগের মধ্যেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
মার্কিন সিনেটর রন ওয়াইডেনের প্রকাশিত এক চিঠিতে বিষয়টি উঠে এসেছে। কয়েকজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তাও রয়টার্সকে জানিয়েছেন, তাঁদের ব্যবহৃত বিভিন্ন ধরনের মুঠোফোন ও কম্পিউটারে অ্যাড ট্র্যাকার বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
‘অ্যাড ট্র্যাকার’ এমন একটি প্রযুক্তি, যা ডিভাইস ব্যবহারকারীর অবস্থান, ব্রাউজিং তথ্য, অ্যাপ ব্যবহারের ধরন এবং অন্যান্য অনলাইন কার্যকলাপের তথ্য সংগ্রহ ও অনুসরণ করতে পারে। সাধারণত এসব তথ্য ব্যবহারকারীর পছন্দ অনুযায়ী বিজ্ঞাপন দেখানোর কাজে ব্যবহার করা হয়। তবে একই ধরনের তথ্য নিরাপত্তাঝুঁকিও তৈরি করতে পারে।
মার্কিন বিমানবাহিনী সিনেটর ওয়াইডেনকে জানিয়েছে, প্রায় দুই মাস আগে তাদের কম্পিউটার ও মুঠোফোনে থাকা অ্যাড ট্র্যাকার নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। মার্কিন স্পেশাল অপারেশনস কমান্ডও জানিয়েছে, সম্প্রতি তাদের উইন্ডোজচালিত ডিভাইসগুলোয় এ ধরনের শনাক্তকারী ব্যবস্থা বন্ধ করা হয়েছে।
অন্যদিকে মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছে, চলতি বছরের শুরু থেকেই তাদের মুঠোফোনে থাকা অ্যাড ট্র্যাকার নিষ্ক্রিয় রাখা হয়েছে। সেনাবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, উইন্ডোজ কম্পিউটারে বিজ্ঞাপন আইডি ২০২১ সালের আগেই নিষ্ক্রিয় করা হয়েছিল। আর অ্যান্ড্রয়েড ও অ্যাপলের মুঠোফোনে অন্তত ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করা হয়েছে।
ওরেগনের ডেমোক্র্যাট সিনেটর রন ওয়াইডেন কয়েক মাস ধরে পেন্টাগনের কাছে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিলেন। তাঁর উদ্বেগের মূল বিষয়, বিজ্ঞাপনশিল্পে সংগৃহীত লোকেশন ডেটা পরে ডেটা ব্রোকারদের মাধ্যমে অন্যদের কাছে বিক্রি হতে পারে। যুদ্ধক্ষেত্রে থাকা সামরিক সদস্যদের অবস্থান শনাক্ত করতে এমন তথ্য ব্যবহার করা সম্ভব।
ডেটা ব্রোকার হলো এমন প্রতিষ্ঠান, যারা বিভিন্ন উৎস থেকে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ও সংকলন করে এবং পরে তা অন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিভিন্ন শাখা তাদের ডিভাইসে বিজ্ঞাপন আইডি নিষ্ক্রিয় করার কথা জানালেও এসব পদক্ষেপ ঠিক কবে থেকে কার্যকর হয়েছে, সে বিষয়ে সব শাখা বিস্তারিত তথ্য দেয়নি।
মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা একই সঙ্গে মুঠোফোন ব্যবহারের ওপর আরও কঠোর বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়ও বিবেচনা করছেন। এর আগে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, মধ্যপ্রাচ্যে মোতায়েন কিছু মার্কিন সেনাকে তাঁদের ফোন জমা দিতে বলা হতে পারে। ইন্টারনেটে প্রকাশিত ভিডিও ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্যের মাধ্যমে সামরিক ঘাঁটির অবস্থান সম্পর্কে তথ্য ফাঁস হওয়ার আশঙ্কা থেকেই এমন পদক্ষেপের কথা ভাবা হচ্ছে।
ওয়াইডেন ও নর্থ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান প্রতিনিধি প্যাট হ্যারিগান গত শুক্রবার পেন্টাগনের কাছে এ বিষয়ে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। সামরিক বাহিনী ও তাদের সদস্যদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্যের বাণিজ্যিক ব্যবহার থেকে তৈরি ঝুঁকি যথাযথভাবে মোকাবিলা করা হচ্ছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বলেছেন তাঁরা।
ওয়াইডেনের মতে, সামরিক বাহিনীর নেওয়া পদক্ষেপগুলো এই হুমকি মোকাবিলায় যথেষ্ট কার্যকর কি না, তা এখন পর্যালোচনা করা জরুরি। অন্যদিকে হ্যারিগানও যুক্তরাষ্ট্রের শত্রুদের কাছে এমন তথ্য পৌঁছানোর ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছেন, যা মার্কিন সেনাদের গতিবিধি অনুসরণে কাজে লাগতে পারে।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাডভার্টাইজিং আইডি নিষ্ক্রিয় করা ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এতে সব ধরনের অবস্থান শনাক্তকরণের ঝুঁকি দূর হয় না। কারণ, ডিভাইসের প্রযুক্তিগত তথ্যের সঙ্গে নেটওয়ার্ক বা অন্যান্য লোকেশন ডেটা মিলিয়ে ব্যবহারকারীর অবস্থান সম্পর্কে ধারণা পাওয়া সম্ভব।
মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে সামরিক বাহিনীর ডিজিটাল নিরাপত্তা ও ব্যক্তিগত তথ্যের বাণিজ্যিক ব্যবহারের বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। ফলে সামরিক সদস্যদের অবস্থানসংক্রান্ত তথ্য সুরক্ষায় প্রযুক্তিগত ও নীতিগত ব্যবস্থা আরও জোরদার করার চাপ বাড়ছে।

