রাশিয়া ও ইরানের সামরিক সম্পর্ক আরও গভীর হচ্ছে। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত নির্ভুল নিশানার ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণে সক্ষম ৯০টি অত্যাধুনিক ব্যবস্থা ইরানকে সরবরাহের জন্য রপ্তানি আদেশ দিয়েছে মস্কো। ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে এ তথ্য।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর ২০২৬) প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাশিয়ার প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম উৎপাদনসংক্রান্ত ২০২৪ ও ২০২৫ সালের কিছু নথিতে ৯০টি এপিইউ-এল (APU-L) উৎক্ষেপক রপ্তানির আদেশের তথ্য পাওয়া গেছে। সেখানে ক্রেতার পরিচয় হিসেবে ‘কে-১০’ সাংকেতিক নাম ব্যবহার করা হয়েছে। রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় অস্ত্র রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান ইরানকে বোঝাতে এই সাংকেতিক নাম ব্যবহার করে।
তবে এসব উৎক্ষেপক শেষ পর্যন্ত ইরানের কাছে পৌঁছেছে কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহৃত ক্ষেপণাস্ত্র পেতে পারে ইরান
রাশিয়ার এপিইউ-এল উৎক্ষেপকগুলো এলএমইউআর (LMUR) বা ‘ইজদেলিয়ে-৩০৫’ নামের নির্ভুল নিশানার গাইডেড ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহারের জন্য তৈরি। ২০২২ সালে রুশ সামরিক বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার পর থেকে ইউক্রেন যুদ্ধে ক্ষেপণাস্ত্রটি ব্যবহার করা হচ্ছে।
এই ক্ষেপণাস্ত্রের বিশেষত্ব হলো, উড্ডয়নের সময় অপারেটর এর গতিপথ নিয়ন্ত্রণ ও প্রয়োজন অনুযায়ী নিশানা পরিবর্তন করতে পারেন। ফলে চলমান লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতা রয়েছে এর।
মার্কিন সেনাবাহিনীর ওয়ার্ল্ডওয়াইড ইকুইপমেন্ট গাইড অনুযায়ী, এপিইউ-এল উৎক্ষেপক রাশিয়ার এমআই-২৮ অ্যাটাক হেলিকপ্টারে ব্যবহারের উপযোগী। প্রতিটি উৎক্ষেপকে দুটি করে ক্ষেপণাস্ত্র বহন করা যায়।
ইতোমধ্যে রাশিয়ার কাছ থেকে এমআই-২৮ হেলিকপ্টার সংগ্রহ করেছে ইরান। ২০২৩ সালের নভেম্বরে ইরানি কর্মকর্তারা এসব হেলিকপ্টার সরবরাহের বিষয়ে চূড়ান্ত সমঝোতার কথা জানিয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে তেহরানের একটি বিমান চলাচল কেন্দ্রে এমআই-২৮ হেলিকপ্টারের ছবি প্রকাশিত হয়।
সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতেও রাশিয়ার সহযোগিতা
ইরানের সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে রাশিয়ার সহযোগিতার আরেকটি দিক উঠে এসেছে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের আগের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে।
গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, সি৪৩০এল (C430L) সাংকেতিক নামের একটি গোপন কর্মসূচির আওতায় ইরানকে সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্রের প্রযুক্তি উন্নয়নে সহায়তা দিয়েছে রাশিয়া।
ফাঁস হওয়া চিঠিপত্র, ভ্রমণসংক্রান্ত নথি ও সামরিক পেটেন্ট পর্যালোচনা করে সংবাদমাধ্যমটি জানায়, ২০২৩ সালে এই কর্মসূচি শুরু হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল র্যামজেট প্রযুক্তির উন্নয়ন। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে শব্দের গতির কয়েক গুণ বেশি গতিতে ক্ষেপণাস্ত্র চালানো সম্ভব।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, রুশ প্রকৌশলীরা একাধিকবার ইরান সফর করেছেন। তারা ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের উড্ডয়ন পরীক্ষার তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন এবং জ্বালানি ব্যবস্থা, দহনপ্রক্রিয়া, বায়ুপ্রবেশ ব্যবস্থা ও ইঞ্জিনের নকশা নিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন।
তবে রাশিয়ার সহায়তায় তৈরি কোনো সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ইরানের সামরিক বাহিনীতে কার্যকরভাবে যুক্ত হয়েছে, এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জন্য কেন গুরুত্বপূর্ণ এই প্রযুক্তি?
ইরানের সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তৈরির উদ্যোগকে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সামরিক নিরাপত্তার সঙ্গে সম্পর্কিত বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ইরানবিষয়ক সাবেক সিআইএ সামরিক বিশ্লেষক জিম ল্যামসনের মতে, এ ধরনের প্রযুক্তি ইরানকে নতুন কৌশলগত অস্ত্রের সক্ষমতা দিতে পারে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনীর জাহাজগুলোর জন্য এটি সম্ভাব্য হুমকি তৈরি করতে পারে।
কারণ, সুপারসনিক গতিতে চলা ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার প্রতিক্রিয়া জানানোর সময় কমে যেতে পারে।
কনফ্লিক্ট আর্মামেন্ট রিসার্চের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক ফ্যাবিয়ান হিনজের মতে, রাশিয়ার কাছ থেকে এ ধরনের সংবেদনশীল সামরিক প্রযুক্তি পাওয়া ইরানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি।
রাশিয়া-ইরান সামরিক সম্পর্কের নতুন মাত্রা
রাশিয়া ও ইরানের সামরিক সহযোগিতা একমুখী নয়। ইউক্রেন যুদ্ধে ব্যবহারের জন্য রাশিয়াকে শাহেদ অ্যাটাক ড্রোন সরবরাহ করেছে ইরান। একই সঙ্গে রাশিয়ায় এসব ড্রোনের নিজস্ব উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তুলতেও সহায়তা করেছে তেহরান।
অন্যদিকে রাশিয়ার কাছ থেকে অস্ত্র ও সামরিক প্রযুক্তিগত সহায়তা পাচ্ছে ইরান। এর আগে ইরানকে কাঁধে বহনযোগ্য ভার্বা আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সরবরাহের বিষয়েও সম্মত হওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে পশ্চিমা গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক সংঘাতের মধ্যে মস্কো ও তেহরানের সামরিক অংশীদারত্ব আরও জোরদার হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, ইরানকে সামরিক সহযোগিতা করলেও রাশিয়া যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখতে চাইছে। ফলে মস্কোর সহযোগিতারও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
সব মিলিয়ে ৯০টি ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপকের রপ্তানি আদেশ এবং সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তিতে সহযোগিতার তথ্য রাশিয়া-ইরান সামরিক সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে এনেছে। তবে এসব সরঞ্জাম ও প্রযুক্তি বাস্তবে ইরানের সামরিক সক্ষমতায় কতটা যুক্ত হবে, তা নির্ভর করছে সরবরাহ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের অগ্রগতির ওপর।

