জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য, সরকারি সেবার অবনতি ও আবাসনসংকটের প্রতিবাদে ইউরোপের বিভিন্ন দেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। সবচেয়ে বেশি সহিংস পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে ফ্রান্সে। সেখানে বিক্ষোভ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনার পর উত্তরাঞ্চলের চার শহরে আংশিক কারফিউ জারি করেছে সরকার।
গত শনিবার (১৭ অক্টোবর) ফ্রান্সজুড়ে বিপুলসংখ্যক মানুষ বিক্ষোভে অংশ নেন। শুরুতে অনেক জায়গায় কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও পরে কয়েকটি শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে ভাঙচুর চালানো হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী মোতায়েন করা হলেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়।
ফ্রান্সের চার শহরে আংশিক কারফিউ
সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ফ্রান্সের উত্তরাঞ্চলের লিল, দোয়ে, ওয়াতিনিয়ে ও দেনাঁ শহরে আংশিক কারফিউ জারি করা হয়েছে। স্থানীয় সময় রাত ৮টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত এই বিধিনিষেধ কার্যকর রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
বিক্ষোভ ও সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রায় ৩ হাজারে পৌঁছেছে। সংঘর্ষে বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী আহত হয়েছেন। পুলিশের ব্যবহার করা ভিড় নিয়ন্ত্রণের একটি গ্রেনেডে এক বিক্ষোভকারীর হাত বিচ্ছিন্ন হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে।
ফরাসি প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু বলেছেন, দেশে জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে সরকার দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। পরিস্থিতি বিবেচনায় জরুরি অবস্থা জারির সম্ভাবনাও নাকচ করেননি তিনি। তবে রাজধানী প্যারিসজুড়ে একসঙ্গে কারফিউ জারির বিষয়ে সতর্ক অবস্থান নিয়েছে সরকার।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও জ্বালানির দাম নিয়ে ক্ষোভ
ফ্রান্সে বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে ক্রমবর্ধমান জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ। কয়েক সপ্তাহ আগে শিক্ষাব্যবস্থার সমস্যা ও স্কুলের পরিবেশের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শুরু হয়। পরে তাতে অন্য শ্রেণি-পেশার মানুষও যুক্ত হন।
প্রতিবাদকারীদের ক্ষোভের কেন্দ্রে রয়েছে দৈনন্দিন ব্যয় সামলানোর চাপ। জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পরিবহন ও অন্যান্য খরচ বাড়িয়ে দেওয়ায় সাধারণ মানুষের জীবন আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।
সহিংসতার পর প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ ঘটনার নিন্দা জানিয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী ও ভাঙচুর-লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের আলাদা করে দেখার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। অন্যদিকে, ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনিয়েজ পদত্যাগের প্রস্তাব দিলেও তা গ্রহণ করেননি প্রেসিডেন্ট। পরিস্থিতি মোকাবিলায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
লুট হওয়া পণ্য বিক্রি ঠেকাতে উদ্যোগ
ফ্রান্সে বিক্ষোভের সময় বিভিন্ন দোকান ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে। পরে এসব পণ্যের কিছু অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন দেশটির ডিজিটালবিষয়ক মন্ত্রী আন ল্য হেনানফ।
এ ঘটনায় ভিনটেড, অ্যামাজন, ইবে, লেবনকোয়াঁ, মেটা ও টিকটকের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। লুট হওয়া পণ্য বিক্রির বিজ্ঞাপন দ্রুত সরানো এবং অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করতে কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে।
ইতালিতেও সংঘর্ষ ও গ্রেপ্তার
জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি সেবার মান নিয়ে অসন্তোষ থেকে ইতালির মিলান, বোলোনিয়া, ব্রেশিয়া, বেরগামো ও তুরিনে বিক্ষোভ হয়েছে। মিলানে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষের সময় কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করা হয়।
রোববার মিলানে ২৭১ জনকে থানায় নেওয়া হয়। তাঁদের মধ্যে ৩২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। আরও কয়েকজনের বিষয়ে বিচারিক কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে।
ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি সহিংসতার নিন্দা জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিক্ষোভ করার অধিকার থাকলেও শহরে আগুন দেওয়া বা সম্পত্তি ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই।
আবাসনসংকটে ক্ষোভ পর্তুগাল ও স্পেনে
পর্তুগালে বাড়িভাড়া ও আবাসনের ক্রমবর্ধমান ব্যয়ের প্রতিবাদে রাজধানী লিসবন ও পোর্তোতে বিক্ষোভ হয়েছে। লিসবনের রসিও চত্বরে বিক্ষোভকারীদের তাঁবু খাটিয়ে অবস্থান নিতে দেখা গেছে।
সরকারি হিসাব অনুযায়ী, ২০১৫ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে পর্তুগালে বাড়ির দাম ১২৪ শতাংশ বেড়েছে। এতে সাধারণ মানুষের পক্ষে বাড়ি কেনা ও ভাড়া নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
স্পেনেও বাড়িভাড়া বৃদ্ধি, উচ্ছেদ ও আবাসনসংকট নিয়ে আন্দোলন চলছে। ভাড়াটেদের সুরক্ষা এবং আবাসনসংকট সমাধানে রাজনৈতিক পদক্ষেপের দাবিতে মাদ্রিদসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়েছে।
বেলজিয়াম ও আলবেনিয়াতেও বিক্ষোভ
বেলজিয়ামের ব্রাসেলস ও লিয়েজে শিক্ষা খাতের ব্যয় এবং সরকারি ব্যয় সংকোচনের প্রতিবাদে বিক্ষোভ হয়েছে। কিছু জায়গায় পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।
আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ, উচ্চ টিউশন ফি ও সরকারবিরোধী ক্ষোভ থেকে বিক্ষোভ চলছে। সেখানে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষের পাশাপাশি অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
ইউরোপজুড়ে উদ্বেগ, সামনে আরও কর্মসূচি
ফ্রান্সে নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়েছে। শ্রমিক সংগঠনগুলোও দেশব্যাপী ধর্মঘটের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এদিকে কয়েকটি দেশ নিজেদের নাগরিকদের বড় জমায়েত এড়িয়ে চলার পরামর্শ দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এসব বিক্ষোভের সবগুলো একই আন্দোলনের অংশ নয়। দেশভেদে দাবির পার্থক্য থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য, আবাসনসংকট এবং সরকারি সেবার মান নিয়ে মানুষের অসন্তোষের মিল রয়েছে।
পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারগুলোকে একদিকে জনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে হচ্ছে, অন্যদিকে নাগরিকদের অর্থনৈতিক চাপ ও জীবনযাত্রার সমস্যা মোকাবিলার দাবিও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হচ্ছে।

