বিনোদন ডেস্ক
সুপারহিরোদের জনপ্রিয়তা বহু দশকের। তবে সুপারম্যান বা ব্যাটম্যানের মতো চরিত্রের পাশে স্পাইডার-ম্যানের আবেদন কিছুটা আলাদা। তাঁর শক্তি যেমন দর্শককে মুগ্ধ করে, তেমনি তাঁর ভয়, দ্বিধা, প্রেম, ভুল ও ব্যক্তিগত সংকট তাঁকে মানুষের খুব কাছাকাছি নিয়ে আসে। আর এ কারণেই প্রজন্মের পর প্রজন্ম স্পাইডার-ম্যানকে ভালোবেসে আসছে।
২০২১ সালে ‘Spider-Man: No Way Home’ মুক্তির পর চরিত্রটির জনপ্রিয়তা আরও একবার স্পষ্ট হয়। সিনেমাটিতে টম হল্যান্ড, অ্যান্ড্রু গারফিল্ড ও টোবি ম্যাগুয়ারকে একই গল্পে দেখা যায়। যুক্তরাষ্ট্রে ছবিটি ৮১ কোটি ৪০ লাখ ডলারের বেশি আয় করে। এর আগে ‘Spider-Man: Into the Spider-Verse’ বহুমাত্রিক জগতের ধারণাকে স্পাইডার-ম্যানের গল্পের সঙ্গে মিলিয়ে চরিত্রটিকে নতুনভাবে উপস্থাপন করেছিল।
এখন ‘Spider-Man: Brand New Day’ আবারও চরিত্রটির জনপ্রিয়তাকে সামনে নিয়ে এসেছে। ছবিতে টম হল্যান্ডের পিটার পার্কার ও এমজে চরিত্রে জেন্ডায়ার সম্পর্কেও নতুন টানাপোড়েন দেখা যায়। পিটার এখন আর কিশোর নয়; প্রাপ্তবয়স্ক জীবনের দিকে এগিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর সংকটও বদলে যাচ্ছে।
সুপারম্যান-বেটম্যানের পর কেন স্পাইডার-ম্যান?
গত পাঁচ দশকে আমেরিকান কমিকসের সিনেমায় সুপারম্যান ও ব্যাটম্যানের দীর্ঘ আধিপত্য ছিল। ক্রিস্টোফার রিভের ‘সুপারম্যান’ সিনেমাগুলো এখনো সুপারহিরো চলচ্চিত্রের অন্যতম সফল উদাহরণ হিসেবে বিবেচিত হয়। অন্যদিকে ব্যাটম্যানের বিশেষত্ব ছিল তাঁর মানবিক সীমাবদ্ধতা। তাঁর কোনো অতিমানবীয় শক্তি নেই; নিজের দক্ষতা, বুদ্ধি ও মানসিক শক্তির ওপরই তাঁকে নির্ভর করতে হয়।
স্পাইডার-ম্যান এই দুই চরিত্রের মাঝামাঝি একটি জায়গা তৈরি করেছে। তাঁর রয়েছে অসাধারণ ক্ষমতা, কিন্তু তিনি কোনো অজেয় দেবতা নন। তিনি ভুল করেন, ভয় পান, প্রেমে পড়েন, পরিচয় নিয়ে সংকটে ভোগেন এবং বারবার নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করেন।
সবচেয়ে বড় শক্তি—মানবিকতা
স্পাইডার-ম্যানের জনপ্রিয়তার অন্যতম কারণ তাঁর ‘আমাদের মতো’ হয়ে থাকা। পিটার পার্কার শুরুতে একজন সাধারণ স্কুলছাত্র। মাকড়সার কামড়ে তাঁর শরীরে পরিবর্তন আসে, কিন্তু সুপারহিরো হয়ে যাওয়ার পরও স্কুল, বন্ধু, প্রেম ও পারিবারিক সমস্যাগুলো তাঁর জীবন থেকে হারিয়ে যায় না।
অপরাধীদের সঙ্গে লড়াইয়ের পাশাপাশি তাঁকে নিজের পরিচয় গোপন রাখতে হয়। বন্ধুদের সঙ্গে সম্পর্ক, প্রেমের জটিলতা এবং নিজের দায়িত্ব—সবকিছুর সঙ্গে একসঙ্গে লড়তে হয় তাঁকে। ফলে দর্শক তাঁর মধ্যে নিজেদের জীবনের অনেক পরিচিত সংকট খুঁজে পান।
টম হল্যান্ডের অভিনয় এই মানবিক দিকটিকে আরও শক্তিশালী করেছে। তাঁর পিটার পার্কারে যেমন শারীরিক সক্ষমতা রয়েছে, তেমনি আছে লাজুকতা, অনিশ্চয়তা ও অপ্রস্তুত ভাব। এই বৈশিষ্ট্যগুলোই চরিত্রটিকে দর্শকের কাছে আরও আপন করে তুলেছে।
নিউইয়র্কও যেন চরিত্রটির অংশ
স্পাইডার-ম্যানকে অন্য অনেক সুপারহিরোর থেকে আলাদা করে তাঁর শহর। নিউইয়র্কের উঁচু ভবনের মধ্যে জাল ছুড়ে দোল খাওয়া শুধু অ্যাকশন নয়, চরিত্রটির পরিচয়ের অংশ।
তাঁর বন্ধুরা, প্রতিবেশী ও শহরের মানুষ মিলে একটি পরিচিত সামাজিক পরিসর তৈরি করে। ফলে স্পাইডার-ম্যানকে দূরের কোনো মহাবীর মনে হয় না; বরং নিজের শহরের একজন তরুণ হিসেবে মনে হয়।
সুপারহিরো ক্লান্তির মধ্যেও স্পাইডার-ম্যান কেন টিকে আছে
সিনেমায় এখন সুপারহিরোর সংখ্যা এত বেশি যে দর্শকের একাংশের মধ্যে একধরনের ক্লান্তি তৈরি হয়েছে। অ্যাভেঞ্জার্স, এক্স-মেন কিংবা ফ্যান্টাস্টিক ফোরের মতো দলীয় উপস্থিতিতে ‘সুপারহিরো’ ধারণাটিই অনেক সময় অতিরিক্ত পরিচিত মনে হয়।
স্পাইডার-ম্যান এই ক্লান্তির মধ্যে ভিন্ন অভিজ্ঞতা দেয়। তাঁর গল্পের কেন্দ্রে শুধু ক্ষমতা নয়, মানুষের জীবন। তিনি যত বড় নায়কই হোন, নিজের দুর্বলতা ও মানসিক সংকট থেকে মুক্ত নন।
‘Brand New Day’-তেও যখন তাঁর ক্ষমতা ও পরিচয় নিয়ে নতুন অস্থিরতা তৈরি হয়, তখন চরিত্রটি আবারও দর্শকের বাস্তব জীবনের অনিশ্চয়তার সঙ্গে মিলে যায়।
আলো ও অন্ধকারের মাঝামাঝি এক নায়ক
সুপারম্যান ছিলেন আশাবাদ ও শক্তির প্রতীক। ব্যাটম্যানের মধ্যে ছিল অন্ধকার, শোক ও আত্মসংগ্রাম। স্পাইডার-ম্যান যেন এই দুই মেরুর মাঝামাঝি অবস্থান করেন।
তিনি ভবিষ্যতের প্রতি আশাবাদী, কিন্তু নিজের ভয় ও কষ্টও বহন করেন। তিনি মুখোশ পরেন, নিজের পরিচয় লুকান, আবার মানুষের জীবনেও গভীরভাবে জড়িয়ে থাকেন। এই বৈপরীত্যই তাঁকে সময়ের সঙ্গে প্রাসঙ্গিক রাখে।
আজকের অনিশ্চিত সময়ে মানুষও অনেকটা এমন অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—অন্ধকারের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চায়, কিন্তু নিজের জীবনেই নানা সংকটে আটকে থাকে। স্পাইডার-ম্যান সেই অনুভূতিকে ধারণ করেন বলেই হয়তো তাঁর আবেদন এত দীর্ঘস্থায়ী।
শেষ পর্যন্ত স্পাইডার-ম্যান কোনো নিখুঁত, অজেয় দেবতা নন। তিনি ভুল করেন, ভয় পান, প্রেমে পড়েন, নিজের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং পড়ে গিয়ে আবার উঠে দাঁড়ান। সম্ভবত এ কারণেই তাঁকে এত ভালোবাসে মানুষ—কারণ তাঁর মধ্যে আমরা নিজেদেরই কিছুটা দেখতে পাই।

