SSC ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনে এবার নতুন রেকর্ড তৈরি হয়েছে। ফলাফলে সন্তুষ্ট না হয়ে নির্ধারিত সাত দিনের মধ্যে ৪ লাখ ২৫১ জন শিক্ষার্থী মোট ১২ লাখ ৮৭ হাজার ৯২৬টি বিষয়ে নম্বর পরিবর্তনের আবেদন করেছেন।

শিক্ষা বোর্ডসংশ্লিষ্টদের মতে, এ বছর খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন অস্বাভাবিক হারে বাড়ার পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হলো মূল্যায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন। প্রচলিত নিয়মে শুধু নম্বর যোগ-বিয়োগ বা কোনো উত্তর মূল্যায়ন বাদ পড়েছে কি না—এ ধরনের বিষয় যাচাইয়ের পরিবর্তে এবার পুরো উত্তরপত্র মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

৪ লাখের বেশি শিক্ষার্থীর আবেদন

SSC ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিজেদের নম্বর নিয়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। নির্ধারিত সাত দিনের মধ্যে ৪ লাখ ২৫১ জন শিক্ষার্থী খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেন।

আবেদন করা বিষয়গুলোর মধ্যে ১০ লাখ ৫৬ হাজার ৪৫৫টি তাত্ত্বিক বা লিখিত বিষয় এবং ২ লাখ ৩১ হাজার ৪৭১টি ব্যবহারিক বিষয় রয়েছে। অর্থাৎ গড়ে একজন শিক্ষার্থী প্রায় তিনটি বিষয়ে পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছেন।

এই সংখ্যা গত বছরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি। বিশেষ করে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে আবেদনের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি হওয়ায় বিষয়টি আরও আলোচনায় এসেছে।

ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে সবচেয়ে বেশি আবেদন

বোর্ডভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি আবেদন জমা পড়েছে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডে। এ বোর্ডে মোট ৩ লাখ ৩৫ হাজার ৬৭৭টি আবেদন করা হয়েছে।

এর মধ্যে তাত্ত্বিক বিষয়ে আবেদন রয়েছে ২ লাখ ৭৭ হাজার ৬৬৫টি এবং ব্যবহারিক বিষয়ে ৫৮ হাজার ১২০টি।

ঢাকা বোর্ডে ইংরেজি ও গণিতের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করেছেন। ইংরেজিতে ৪৬ হাজারের বেশি এবং গণিতে ৩৪ হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে।

অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের চিত্র

ঢাকা ছাড়াও দেশের অন্য শিক্ষা বোর্ডগুলোতে বিপুলসংখ্যক আবেদন পড়েছে। কুমিল্লা বোর্ডে ১ লাখ ১২ হাজার ৬১১টি, রাজশাহী বোর্ডে ১ লাখ ২২ হাজার ২২৮টি এবং যশোর বোর্ডে ৯১ হাজার ৫৯টি আবেদন করা হয়েছে।

চট্টগ্রাম বোর্ডে আবেদন হয়েছে ১ লাখ ৩৭ হাজার ৬০১টি। এছাড়া বরিশাল বোর্ডে ৬১ হাজার ৮৬টি, সিলেট বোর্ডে ৬০ হাজার ৯৭৪টি, দিনাজপুর বোর্ডে ১ লাখ ১১ হাজার ২৬০টি এবং ময়মনসিংহ বোর্ডে ৮৭ হাজার ১৫৭টি আবেদন জমা পড়েছে।

মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ১৭ হাজার ৫৯টি এবং কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ৫১ হাজার ২১৪টি আবেদন করা হয়েছে।

কেন এত বেশি পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন?

এবারের রেকর্ডসংখ্যক আবেদনের পেছনে বেশ কয়েকটি কারণ রয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো খাতা পুনর্নিরীক্ষণের পদ্ধতিতে পরিবর্তন।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য অনুযায়ী, এবার প্রচলিত অর্থে শুধু খাতার নম্বর যোগ করা, কোনো উত্তর মূল্যায়ন হয়েছে কি না বা নম্বর গণনায় ভুল হয়েছে কি না—এসব বিষয় নয়; বরং পুরো উত্তরপত্র পুনরায় মূল্যায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে।

এই পরিবর্তনের কারণে অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, পুনর্মূল্যায়নের পর তাদের নম্বর বা গ্রেড পরিবর্তিত হতে পারে। ফলে আগের তুলনায় বেশি শিক্ষার্থী এই সুযোগটি ব্যবহার করেছেন।

কমেছে পাসের হার ও GPA-5

পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন বাড়ার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ হলো এ বছর SSC ও সমমান পরীক্ষার ফলাফলে পরিবর্তন।

এ বছর গড় পাসের হার ছিল ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশ। আগের বছর এই হার ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে পাসের হার কমেছে ৬ দশমিক ২০ শতাংশ।

একই সময়ে GPA-5 পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আগের বছরের তুলনায় ২২ হাজারের বেশি কমেছে।

ফলে অনেক শিক্ষার্থী প্রত্যাশিত ফল না পাওয়ায় খাতা পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ নিয়েছেন। বিশেষ করে পাস করতে পারেননি এমন শিক্ষার্থী, কম নম্বর পেয়ে গ্রেড পরিবর্তন না হওয়া শিক্ষার্থী এবং প্রত্যাশার তুলনায় কম নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে আবেদন করার প্রবণতা বেড়েছে।

এবার মূল্যায়নে ছিল বেশি সতর্কতা

শিক্ষা বোর্ডগুলোর পক্ষ থেকে এ বছর পরীক্ষার খাতা মূল্যায়নে তুলনামূলক বেশি সতর্কতা ও কঠোরতা অনুসরণ করা হয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

পরীক্ষাকেন্দ্রে নজরদারি, উত্তরপত্র মূল্যায়নে নির্ধারিত মানদণ্ড অনুসরণ এবং পরীক্ষকদের আরও সতর্কতার সঙ্গে খাতা দেখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

এর ফলে অনেক শিক্ষার্থী আগের বছরের তুলনায় কম নম্বর পেয়েছেন বলে মনে করছেন। বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিতের মতো তুলনামূলক কঠিন বিষয়ে প্রত্যাশিত নম্বর না পাওয়ায় পুনর্নিরীক্ষণের আবেদনের হার বেশি হয়েছে।

খাতা পুনর্নিরীক্ষণ কি ফল বদলে দেবে?

রেকর্ডসংখ্যক শিক্ষার্থী খাতা পুনর্নিরীক্ষণের আবেদন করলেও সবার ফল পরিবর্তন হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই।

খাতা পুনর্নিরীক্ষণের পর যদি মূল্যায়নে কোনো ভুল, নম্বর গণনায় সমস্যা বা নির্ধারিত নিয়ম অনুযায়ী সংশোধনের প্রয়োজন পাওয়া যায়, তাহলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীর ফল পরিবর্তন হতে পারে। তবে আবেদন করলেই নম্বর বাড়বে বা গ্রেড পরিবর্তন হবে—এমন কোনো নিশ্চয়তা নেই।

ফলে শিক্ষার্থীদের শুধু আবেদনসংখ্যা দেখে ফল পরিবর্তনের বিষয়ে অতিরিক্ত প্রত্যাশা না করে সংশোধিত ফল প্রকাশ পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের অধিকার ও মূল্যায়ন ব্যবস্থার আস্থার প্রশ্ন

খাতা পুনর্নিরীক্ষণের সুযোগ শিক্ষার্থীদের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধিকার। এর মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী তার ফলাফলে কোনো অসঙ্গতি থাকলে তা পুনরায় যাচাইয়ের সুযোগ পান।

তবে এবারের বিপুল আবেদন পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ব্যবস্থা নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা ও আস্থার বিষয়টিও সামনে এনেছে। অনেক শিক্ষার্থী মনে করছেন, তাদের প্রাপ্ত নম্বর প্রত্যাশিত নয় এবং পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে সেটি সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।

শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, মূল্যায়ন প্রক্রিয়া যত বেশি স্বচ্ছ, নির্ভুল ও নির্ভরযোগ্য হবে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ফলাফল নিয়ে অনিশ্চয়তাও তত কমবে।

নতুন পদ্ধতিতে কী পরিবর্তন আসতে পারে?

এবার পুরো উত্তরপত্র মূল্যায়নের সুযোগ তৈরি হওয়ায় পুনর্নিরীক্ষণ প্রক্রিয়ার গুরুত্ব আগের তুলনায় বেড়েছে। এতে শুধু হিসাবগত ভুল খোঁজার বদলে উত্তরপত্রের মূল্যায়ন আরও বিস্তৃতভাবে দেখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তবে এ পদ্ধতি বাস্তবায়নে শিক্ষা বোর্ডগুলোর ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। বিপুলসংখ্যক আবেদন দ্রুত যাচাই করে নির্ভুল ফল প্রকাশ করতে সংশ্লিষ্টদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

সামনে কী হতে পারে?

SSC খাতা পুনর্নিরীক্ষণে এবারের record সংখ্যক আবেদন শিক্ষার্থীদের ফলাফল নিয়ে আগ্রহ ও উদ্বেগ—দুই দিকই তুলে ধরেছে। নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে এই আবেদন বেড়েছে বলে শিক্ষা বোর্ডসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য।

এখন মূল অপেক্ষা পুনর্নিরীক্ষণের ফল প্রকাশের। কতজন শিক্ষার্থীর নম্বর বা গ্রেড পরিবর্তন হয়, সেটিই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। একই সঙ্গে এবারের অভিজ্ঞতা ভবিষ্যতের SSC ও সমমান পরীক্ষার উত্তরপত্র মূল্যায়ন ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও নির্ভুল করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

Doinik Report | দৈনিক রিপোর্ট বাংলাদেশ ও বিশ্বের সর্বশেষ সংবাদ, রাজনীতি, অর্থনীতি, খেলা, বিনোদন ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেট—দ্রুত, তথ্যভিত্তিক ও নির্ভরযোগ্যভাবে। সত্যের পক্ষে | তথ্যের সঙ্গে | পাঠকের পাশে 🇧🇩

Leave A Reply

© 2026 দৈনিক রিপোর্ট | সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ আদিল
Exit mobile version