বাংলাদেশে নিম্ন আয়ের পরিবারের তুলনায় ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা বেশি পাওয়া গেছে। পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের নিয়ে পরিচালিত জাতীয় জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করে এমন চিত্র পেয়েছেন গবেষকেরা। বিশেষজ্ঞদের মতে, সিসার সংস্পর্শ শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা ও শেখার ক্ষমতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি
২০২৫ সালের মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে (মিকস) থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৩৮ দশমিক ৫ শতাংশের রক্তে প্রতি ডেসিলিটারে ৫ মাইক্রোগ্রাম বা তার বেশি সিসা রয়েছে।
পরিবারের আর্থসামাজিক অবস্থার ভিত্তিতে শিশুদের পাঁচটি শ্রেণিতে ভাগ করে দেখা যায়, সবচেয়ে দরিদ্র ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের মধ্যে রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হার ৩০ দশমিক ২ শতাংশ। অন্যদিকে সবচেয়ে ধনী ২০ শতাংশ পরিবারের শিশুদের ক্ষেত্রে এ হার ৫১ দশমিক ৯ শতাংশ।
অর্থাৎ, ধনী পরিবারের শিশুদের মধ্যে রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হার দরিদ্র পরিবারের শিশুদের তুলনায় ২১ দশমিক ৭ শতাংশীয় পয়েন্ট বেশি। পরিবারের সম্পদ, মায়ের শিক্ষা, বসবাসের এলাকা ও ঘরের অবস্থা বিবেচনায় নেওয়ার পরও এই সম্পর্ক দেখা গেছে।
কী কারণে ধনী পরিবারের শিশুদের ঝুঁকি বেশি?
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব হেলথ ইকোনমিকসের গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেন ও মো. ইমাম হাসান গবেষণাটি পরিচালনা করেন। তাঁদের গবেষণার শিরোনাম ‘সোশ্যাল প্যাটার্নিং অব এলিভেটেড ব্লাড লিড অ্যামাং চিলড্রেন এজড ১২–৫৯ মান্থস ইন বাংলাদেশ: অ্যা ন্যাশনাল ক্রস-সেকশনাল অ্যানালাইসিস অব মিকস ২০২৫’। ১৪ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে গবেষণাটি মেডআর্কাইভে প্রকাশিত হয়।
গবেষক সৈয়দ তৌসিক হোসেনের মতে, প্যাকেটজাত খাবার, আসবাব, দেয়ালের রং ও বিভিন্ন ধরনের তৈজসপত্রের মাধ্যমে শিশুদের সিসার সংস্পর্শে আসার সুযোগ তৈরি হতে পারে। এ ছাড়া শিশুরা আমদানি করা খেলনা ও ঘরের সাজসজ্জার সামগ্রীর সংস্পর্শেও আসতে পারে।
তবে এসব সম্ভাব্য উৎস গবেষণায় আলাদাভাবে পরীক্ষা করা হয়নি। তাই নির্দিষ্ট কোনো পণ্য বা খাবারই ধনী পরিবারের শিশুদের রক্তে সিসার মাত্রা বেশি হওয়ার কারণ—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
শিশুদের শরীরে সিসার ক্ষতিকর প্রভাব
সিসা একটি বিষাক্ত ভারী ধাতু। শরীরে প্রবেশের পর এটি রক্তের মাধ্যমে মস্তিষ্ক, যকৃৎ, কিডনি, হাড়সহ বিভিন্ন অঙ্গে পৌঁছাতে পারে। শিশুদের মস্তিষ্ক ও স্নায়ুতন্ত্র বিকাশের পর্যায়ে থাকায় সিসার সংস্পর্শ তাদের জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।
সিসার প্রভাবে শিশুর বুদ্ধিবৃত্তিক সক্ষমতা কমে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা, শেখার অসুবিধা ও আচরণগত পরিবর্তনের ঝুঁকি থাকে। দীর্ঘ মেয়াদে এর প্রভাব শিক্ষাগত অর্জনেও পড়তে পারে। এ ছাড়া সিসার সংস্পর্শ রক্তস্বল্পতা, কিডনির ক্ষতি ও উচ্চ রক্তচাপের সঙ্গে সম্পর্কিত।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মতে, শিশুদের রক্তে সিসার এমন কোনো মাত্রা প্রতিষ্ঠিত নেই, যাকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলা যায়। কম মাত্রার সংস্পর্শেও বিকাশগত ক্ষতি হতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক লক্ষণ দেখা না দেওয়ায় শিশুকে বাইরে থেকে সুস্থ মনে হলেও তার স্বাভাবিক বিকাশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
ঢাকায় শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা সবচেয়ে বেশি
২০২৫ সালের মিকসের প্রাথমিক ফলাফল অনুযায়ী, বিভাগভেদেও শিশুদের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রার হারে বড় পার্থক্য রয়েছে।
ঢাকায় ১২ থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের ৬৫ দশমিক ২ শতাংশের রক্তে সিসার উচ্চমাত্রা পাওয়া গেছে। সিলেটে এ হার ৪৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চট্টগ্রামে ৪২ দশমিক ১ শতাংশ।
অন্যদিকে বরিশালে এ হার ২৯ শতাংশ, ময়মনসিংহে ৩০ দশমিক ৬ শতাংশ, খুলনায় ১৭ দশমিক ৮ শতাংশ, রাজশাহীতে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ এবং রংপুরে ১৯ দশমিক ৬ শতাংশ।
গবেষণাটি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর পরিচালিত জরিপের তথ্যের ওপর ভিত্তি করে করা হয়েছে। জরিপে আগে থেকে সংগৃহীত রক্ত পরীক্ষার ফল ও পরিবারের আর্থসামাজিক তথ্য বিশ্লেষণ করেছেন গবেষকেরা; তাঁরা নতুন করে শিশুদের রক্ত পরীক্ষা করেননি।
শিশুদের সিসার সংস্পর্শ কমাতে সম্ভাব্য দূষণের উৎস শনাক্ত করা, পণ্য ও খাবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় জনস্বাস্থ্য উদ্যোগ জোরদার করা গুরুত্বপূর্ণ।

