মধ্যপ্রাচ্যে আবারও বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্ভাব্য নতুন হামলার হুমকির মধ্যে সামরিক নীতিতে পরিবর্তন আনার ঘোষণা দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। তেহরান জানিয়েছে, ভবিষ্যতে ইরানে হামলা হলে শুধু পাল্টা আঘাত নয়, প্রয়োজনে আরও বিস্তৃত সামরিক অভিযান চালানো হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে ব্যবহৃত ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে তারা।
গত বুধবার (২১ অক্টোবর) ইরানের এ ঘোষণা আসে। এর মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালিতে জাহাজে হামলার খবর, জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ এবং ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক অচলাবস্থা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আল-জাজিরার ২২ অক্টোবরের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, নতুন করে সংঘাত শুরু হওয়ার আশঙ্কা থাকলেও কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তবে দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি হুমকি পরিস্থিতিকে অনিশ্চিত করে তুলেছে।
ইরানের নতুন সামরিক নীতিতে কী আছে?
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী নতুন সামরিক কৌশলকে ‘আক্রমণাত্মক ও অসমতাভিত্তিক’ প্রতিরক্ষানীতি হিসেবে বর্ণনা করেছে। এর অর্থ, শত্রুপক্ষের হামলার জবাবে শুধু প্রতিশোধমূলক আঘাত নয়, বরং প্রতিপক্ষের সামরিক সক্ষমতা ও আঞ্চলিক অবস্থানের ওপর আরও বিস্তৃত চাপ সৃষ্টির প্রস্তুতি রাখবে তেহরান।
আইআরজিসির মুখপাত্র হোসেইন মোহেবি জানিয়েছেন, আগে ইরানের নীতি ছিল আক্রান্ত হলে পাল্টা জবাব দেওয়া। এখন সেই অবস্থান পরিবর্তন করে পাল্টা আঘাতের পাশাপাশি আক্রমণাত্মক অভিযান চালানোর প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
মোহেবির দাবি, ২০২৫ সালের জুনে ইরান ও ইসরায়েলের মধ্যে ১২ দিনের যুদ্ধের পর থেকে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুত দেড় গুণ হয়েছে। ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা, ধ্বংসক্ষমতা ও লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার নির্ভুলতাও বেড়েছে বলে দাবি করেন তিনি। তবে ক্ষেপণাস্ত্রের মোট সংখ্যা কিংবা এসব দাবির স্বাধীন যাচাইযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
ইরানের নতুন সামরিক সক্ষমতার অংশ হিসেবে একটি শক্তিশালী নতুন অস্ত্র প্রকাশের প্রস্তুতির কথাও জানিয়েছেন আইআরজিসির এই মুখপাত্র। তবে অস্ত্রটির প্রকৃত সক্ষমতা সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
হরমুজ প্রণালিতে হামলা, বাড়ছে জ্বালানি নিয়ে উদ্বেগ
মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনার অন্যতম কেন্দ্র হয়ে উঠেছে হরমুজ প্রণালি। পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরকে সংযুক্ত করা এই নৌপথ দিয়ে বিশ্বের বিপুল পরিমাণ জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের জলসীমায় কয়েকটি জাহাজে হামলার খবর পাওয়া গেছে। আইআরজিসির নৌবাহিনীর দাবি, উত্তর পারস্য উপসাগরে চারটি জাহাজে হামলা চালানো হয়েছে। তাদের অভিযোগ, জাহাজগুলো অবৈধভাবে তেল স্থানান্তরের কাজে যুক্ত ছিল। এ ছাড়া প্রণালির পশ্চিমে আরও তিনটি জাহাজ সামুদ্রিক মাইনে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলেও দাবি করেছে ইরানি বাহিনী।
এসব ঘটনার স্বাধীন যাচাই সীমিত হওয়ায় ইরানি বাহিনীর বক্তব্যকে তাদের দাবি হিসেবেই বিবেচনা করা প্রয়োজন।
হরমুজ প্রণালিতে নতুন করে হামলা বাড়লে আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে অপরিশোধিত তেলের দাম, জাহাজ চলাচল, পরিবহন ব্যয় ও পণ্যের সরবরাহব্যবস্থায়।
২১ অক্টোবর প্রকাশিত রয়টার্সের প্রতিবেদনে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন উত্তেজনা ও সৌদি আরবে হুতিদের হামলার প্রেক্ষাপটে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কথা বলা হয়। পরদিন আন্তর্জাতিক বাজারে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ১১০ ডলারের ওপরে ওঠে।
কেন সামরিক নীতিতে পরিবর্তন আনছে তেহরান?
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন নীতির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে সতর্ক করতে চায় ইরান। ভবিষ্যতে দেশটির ওপর হামলা চালালে তার সামরিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক মূল্য অনেক বেশি হবে—এমন বার্তা দিতে চাইছে তেহরান।
সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল পলিসির জ্যেষ্ঠ ফেলো নেগার মোর্তাজাভির মতে, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের সংঘাত থেকে শিক্ষা নিয়ে ইরান তার প্রতিরক্ষা কৌশল পুনর্বিবেচনা করছে।
প্রচলিত সামরিক শক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি প্রতিযোগিতা করা ইরানের জন্য কঠিন। এ কারণে ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন এবং হরমুজ প্রণালিতে কৌশলগত অবস্থান কাজে লাগিয়ে অসমতাভিত্তিক যুদ্ধকৌশলের ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে দেশটি।
এই কৌশলের লক্ষ্য হতে পারে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক পরিকল্পনায় অনিশ্চয়তা সৃষ্টি করা এবং সংঘাতের অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানো। তবে নতুন নীতি বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
যুক্তরাষ্ট্রের পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে?
ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বক্তব্যে সামরিক পদক্ষেপ ও চুক্তির সম্ভাবনা—দুই ধরনের ইঙ্গিতই পাওয়া যাচ্ছে।
আল-জাজিরার প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প বুধবার বলেছিলেন, তেহরানের সঙ্গে আলোচনা আর এগোচ্ছে না এবং শিগগিরই পরিস্থিতিতে নতুন কোনো মোড় আসতে পারে। পরে শুক্রবার ফ্লোরিডায় এক সমাবেশে তিনি ইরানের সঙ্গে সমঝোতা না হলে নতুন করে সামরিক অভিযান চালানোর সম্ভাবনার কথাও উল্লেখ করেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানিয়েছেন, ইরানের সঙ্গে শান্তিচুক্তিতে পৌঁছানো কঠিন। ওয়াশিংটনের অবস্থান হলো, ইরানকে এমন কোনো পারমাণবিক কর্মসূচি চালাতে দেওয়া যাবে না, যা থেকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির সুযোগ তৈরি হয়।
অন্যদিকে তেহরানের দাবি, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তির (এনপিটি) আওতায় তাদের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার রয়েছে। এই বিরোধ দুই দেশের মধ্যে সমঝোতার অন্যতম বড় বাধা।
মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন কূটনীতিকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যে সৌদি আরবে অবস্থানরত জরুরি দায়িত্বে নেই, এমন মার্কিন কূটনৈতিক কর্মী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের দেশটি ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
২৪ অক্টোবর অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরানের পক্ষ থেকে মার্কিন কর্মীদের লক্ষ্যবস্তু করার প্রচেষ্টা বেড়েছে—এমন গোয়েন্দা তথ্যের পর যুক্তরাষ্ট্র জর্ডান, লেবানন, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের দূতাবাসগুলোতেও কর্মীসংখ্যা কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এসব দূতাবাস খোলা থাকলেও সীমিত কার্যক্রমের আওতায় রয়েছে।
তবে মার্কিন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দূতাবাসগুলোতে কর্মী কমানোর সিদ্ধান্তের সঙ্গে ইরানে সম্ভাব্য নতুন মার্কিন-ইসরায়েলি হামলার সরাসরি সম্পর্ক নেই। অর্থাৎ নিরাপত্তা-উদ্বেগ বাড়লেও এ সিদ্ধান্তকে নতুন যুদ্ধ শুরুর নিশ্চিত প্রমাণ হিসেবে দেখা যাবে না।
নতুন যুদ্ধ কি সত্যিই আসন্ন?
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নতুন হামলার আশঙ্কা বেড়েছে। হরমুজ প্রণালিতে সংঘাত ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারে। তবে কূটনৈতিক আলোচনার পথ এখনো পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক চাপের মুখে ইরান কতটা প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারবে, সেটিও বড় প্রশ্ন। অন্যদিকে ইরানকে সামরিকভাবে দুর্বল করার চেষ্টা করলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
নতুন হামলা শুরু হলে শুধু ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল নয়—উপসাগরীয় দেশগুলো এবং বৈশ্বিক অর্থনীতিও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে জ্বালানি সরবরাহ, সমুদ্রপথে পণ্য পরিবহন ও আন্তর্জাতিক বাজারে এর প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে বড় ধরনের নতুন সংঘাতের ঝুঁকি বাড়লেও যুদ্ধ অনিবার্য—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো নিশ্চিত তথ্য এখনো নেই। সামরিক হুঁশিয়ারি, কূটনৈতিক তৎপরতা এবং হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিই আগামী দিনগুলোতে সংঘাতের গতিপথ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
তথ্যসূত্র: আল-জাজিরা

