পানামার দক্ষিণ উপকূলে ৭ দশমিক ৭ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হেনেছে। শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিকেলে আঘাত হানা এই ভূমিকম্পে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় বাড়িঘর ও ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ছয়টি প্রদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ার পাশাপাশি বিমান ও গণপরিবহন চলাচলেও প্রভাব পড়ে। মূল ভূমিকম্পের পর একের পর এক পরাঘাত অনুভূত হওয়ায় আতঙ্কিত মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে রাস্তায় ও খোলা জায়গায় আশ্রয় নেন।
যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (ইউএসজিএস) জানিয়েছে, ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল পানামার পিতালোজা আরিবা এলাকার কাছে। ভূপৃষ্ঠের প্রায় ১২ দশমিক ৬ কিলোমিটার গভীরে এর উৎপত্তি হয়। রাজধানী পানামা সিটি থেকে উৎপত্তিস্থলটি প্রায় ২০০ কিলোমিটার দূরে।
ছয় প্রদেশে বিদ্যুৎ বিভ্রাট, বিমান চলাচলে বিঘ্ন
বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান নাতুরগির তথ্য অনুযায়ী, ভূমিকম্পের কারণে পানামার ছয়টি প্রদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। রাজধানী পানামা সিটিতে সড়কে যানবাহনের দীর্ঘ জট তৈরি হয়। ভবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে বিভিন্ন অফিস থেকে কর্মীদের আগেভাগে ছুটি দেওয়া হয়।
টোকুমেন আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে সাময়িকভাবে ফ্লাইট চলাচল বন্ধ রাখার খবর পাওয়া যায়। একই সঙ্গে শহরের মেট্রোরেল পরিষেবা স্থগিত করা হয় এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে ক্লাস বন্ধ ঘোষণা করা হয়। পরবর্তী প্রতিবেদনে বিমানবন্দরের কার্যক্রম আবার চালু হওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
ভবনে ফাটল, আতঙ্কে রাস্তায় বাসিন্দারা
ভূমিকম্পের পর পানামার বিভিন্ন এলাকায় ভবনে ফাটল ও স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। হেরেরা প্রদেশের লাস মিনাস এলাকায় কয়েকটি বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন।
রাজধানী পানামা সিটিতে অনেক মানুষ ভবন থেকে বেরিয়ে রাস্তা ও পার্কে অবস্থান নেন। স্থানীয় এক বাসিন্দার ভাষ্য অনুযায়ী, কম্পনের সময় বাড়িতে ফাটল দেখা দেওয়ায় সেটি ধসে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ও রাজধানীর মাঝামাঝি পেনোনোমে শহরেও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র সামনে এসেছে। যাচাই করা ভিডিওতে একটি গির্জা ও আশপাশের কয়েকটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হতে দেখা গেছে। হেরেরা প্রদেশের রাজধানী চিত্রে এবং উপকূলীয় লস সান্তোস প্রদেশ থেকেও ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়।
৪০ সেকেন্ড ধরে কম্পন অনুভব
পানামার ভূবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক নেস্টর লুক জানিয়েছেন, আজুয়েরো-সোনা ফল্ট সিস্টেমের সক্রিয়তার কারণে ভূমিকম্পটি হয়েছে। তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে ওই চ্যুতি ব্যবস্থায় চাপ জমা হচ্ছিল। একপর্যায়ে জমে থাকা চাপ থেকে বিপুল শক্তি নির্গত হওয়ায় ভূমিকম্পের সৃষ্টি হয়।
নেস্টর লুক জানান, রাজধানী পানামা সিটিতে প্রায় ৪০ সেকেন্ড ধরে কম্পন অনুভূত হয়েছে। দেশের অন্য কিছু এলাকায় কম্পন আরও বেশি সময় স্থায়ী হয়ে থাকতে পারে।
প্রতিবেশী দেশ কোস্টারিকার রাজধানী সান হোসেতেও ভূমিকম্প অনুভূত হয়েছে বলে প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে জানানো হয়েছে। মূল কম্পনের পর একাধিক পরাঘাত অনুভূত হওয়ায় বিভিন্ন এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
সুনামির আশঙ্কা নেই, ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ চলছে
ভূমিকম্পের পর সুনামির আশঙ্কা তৈরি হলেও যুক্তরাষ্ট্রের সুনামি সতর্কীকরণ ব্যবস্থা পরে জানায়, সুনামির ঝুঁকি কেটে গেছে।
ইউএসজিএসের প্রাথমিক মূল্যায়নে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের কারণে পানামার মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ থেকে ১০ শতাংশের সমপরিমাণ অর্থনৈতিক ক্ষতি হতে পারে। এটি প্রাথমিক অনুমান; প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির হিসাব নিরূপণে আরও মূল্যায়ন প্রয়োজন।
শুক্রবার রাত পর্যন্ত পাওয়া প্রতিবেদনে প্রাণহানির কোনো নিশ্চিত খবর জানানো হয়নি, তবে আহত হওয়ার খবর এসেছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানামা সরকার সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোকে সক্রিয় করেছে। দেশটির প্রেসিডেন্ট হোসে রাউল মুলিনো জনগণকে আতঙ্কিত না হওয়ার এবং বিশৃঙ্খলা এড়িয়ে চলার আহ্বান জানিয়েছেন।
আগামী সোমবার দেশজুড়ে ভূমিকম্প মোকাবিলায় জরুরি স্থানান্তর মহড়া আয়োজনের পরিকল্পনাও রয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে জনগণকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রস্তুতি যাচাই করাই এই মহড়ার উদ্দেশ্য।
সূত্র: রয়টার্স, ইউএসজিএস ও অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি)।

