ভারতের রাজধানী দিল্লিতে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে কঠোর নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে শনিবার (১০ অক্টোবর) যন্তর মন্তরে বিক্ষোভ কর্মসূচিকে ঘিরে মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ, ৫৭টি মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে বিধিনিষেধ এবং একাধিক ট্রেন বাতিলের মতো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিল্লিতে ২৩ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে ব্যারিকেড, সিসিটিভি নজরদারি এবং যানবাহনে তল্লাশি জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় অতিরিক্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে।
২৪ ঘণ্টার জন্য মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ
দিল্লি পুলিশের নির্দেশে জনপথ-कर्तব্য পথ সংযোগস্থলের চার কিলোমিটার ব্যাসার্ধের এলাকায় শুক্রবার (৯ অক্টোবর) রাত ১০টা থেকে শনিবার (১০ অক্টোবর) রাত ১০টা পর্যন্ত মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা বন্ধ রাখার ব্যবস্থা করা হয়।
এ নির্দেশনা বাস্তবায়নে এয়ারটেল, ভোডাফোন আইডিয়া, জিও ও এমটিএনএলসহ টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠানগুলোকে জানানো হয়। টেলিকমিউনিকেশন আইন, ২০২৩ এবং ২০২৪ সালের সাময়িক পরিষেবা স্থগিতের বিধিমালার আওতায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে জুলাই মাসে সিজেপির একটি বিক্ষোভ কর্মসূচিকে কেন্দ্র করেও একই ধরনের ইন্টারনেট বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছিল। সে সময় প্রতিবাদকারীদের ভিডিও প্রকাশ এবং সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতার অভিযোগ ওঠে।
৫৭টি মেট্রো স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথে বিধিনিষেধ
বিক্ষোভ ঘিরে দিল্লি মেট্রোর ৫৭টি স্টেশনে প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। শুক্রবার রাত ৯টা থেকে এসব বিধিনিষেধ কার্যকর করার কথা জানানো হয়েছিল।
রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রাজীব চক, সেন্ট্রাল সেক্রেটারিয়েট, নয়াদিল্লি, প্যাটেল চক, জনপথ, মান্ডি হাউস, আইটিও, দিল্লি গেট, খান মার্কেট, কাশ্মীরি গেট, হাউজ খাস ও লাজপত নগর স্টেশনও এ বিধিনিষেধের আওতায় ছিল।
কিছু রুটে ট্রেন চলাচলের ব্যবধান বাড়ানোর কথাও জানানো হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারচেঞ্জ স্টেশন ব্যবহারকারী যাত্রীদের চলাচলে বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা তৈরি হয়।
যাত্রীদের যাত্রার আগে মেট্রো পরিষেবার সর্বশেষ নির্দেশনা যাচাই করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
দিল্লিগামী একাধিক ট্রেন বাতিল
বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে নয়াদিল্লি ও হজরত নিজামুদ্দিন রেলস্টেশনে যাতায়াতকারী একাধিক ট্রেন বাতিল করা হয়। প্রতিবেদনে শুক্রবার ও শনিবার মিলিয়ে কয়েক ডজন ট্রেন বাতিলের তথ্য দেওয়া হয়েছে। শনিবার ভোর ৪টা থেকে দুপুর ২টার মধ্যে নির্ধারিত বিভিন্ন ট্রেন চলাচলও এতে প্রভাবিত হয়।
রেলযাত্রীদের স্টেশনে যাওয়ার আগে নিজ নিজ ট্রেনের অবস্থা যাচাই করতে বলা হয়েছে। তবে মূল প্রতিবেদনে বাতিল ট্রেনের মোট সংখ্যা নিয়ে হিসাবের অসঙ্গতি রয়েছে। তাই নির্দিষ্ট সংখ্যা নিশ্চিতভাবে উল্লেখ করা হয়নি।
২৩ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের প্রস্তুতি
অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নেয় প্রশাসন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৩ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের পরিকল্পনা ছিল।
কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৮ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনীর (সিএপিএফ) ২২১টি কোম্পানি মোতায়েনের অনুমোদন দেয়। পাশাপাশি দিল্লি পুলিশকে আরও ১১০টি কোম্পানি দেওয়া হয়েছিল।
নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে কেন্দ্রীয় রিজার্ভ পুলিশ বাহিনী (সিআরপিএফ), সীমান্তরক্ষী বাহিনীসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের দায়িত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়। গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ব্যারিকেড, সিসিটিভি ক্যামেরা এবং মুখ শনাক্তকরণ প্রযুক্তির মাধ্যমে নজরদারির পরিকল্পনাও রাখা হয়।
উত্তরপ্রদেশ ও হরিয়ানাসহ প্রতিবেশী রাজ্যগুলোকে সতর্ক থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
বিক্ষোভের অনুমতি দেয়নি দিল্লি পুলিশ
প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে যন্তর মন্তরে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছিল সিজেপি। তবে দিল্লি পুলিশ কর্মসূচির অনুমতি দেয়নি।
পুলিশের বক্তব্য অনুযায়ী, আয়োজকেরা নির্ধারিত ১০ দিনের আগাম নোটিশ দেননি। এ ছাড়া আগের একটি বিক্ষোভে নির্দেশনা লঙ্ঘনের অভিযোগও অনুমতি না দেওয়ার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলা এবং যান চলাচল নিয়ন্ত্রণের স্বার্থে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে পুলিশ জানিয়েছে। মধ্য দিল্লির কিছু এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (বিএনএসএস) ১৬৩ ধারা কার্যকর ছিল। বিধিনিষেধ অমান্য করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সতর্কতাও দেওয়া হয়।
সুপ্রিম কোর্টের প্রশ্নের মুখে বিধিনিষেধ
বিক্ষোভের আগে মেট্রো পরিষেবা ও ট্রেন চলাচলে বিধিনিষেধ নিয়ে ভারতের সুপ্রিম কোর্টও প্রশ্ন তোলে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আদালত সতর্ক করে দেয় যে ছোট সমস্যা মোকাবিলায় অতিরিক্ত কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত নয়।
সিজেপির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং সাধারণ মানুষের চলাচলে একাধিক বিধিনিষেধ দিল্লির স্বাভাবিক জনজীবনে প্রভাব ফেলেছে। বিক্ষোভের পটভূমিতে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ তুলে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ দাবি করছে দলটি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য ও নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে বিষয়টি মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তথ্যসূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড ও আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন

