একটি শহরকে ‘বিশ্বের সেরা’ বলা সহজ নয়। কোথাও অর্থনীতি শক্তিশালী, কোথাও জীবনযাত্রা আরামদায়ক, আবার কোনো শহর পরিবেশ বা প্রশাসনিক দক্ষতায় এগিয়ে। কিন্তু এই সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিলে কোন শহর সবার ওপরে থাকে?
২০২৬ সালের অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের গ্লোবাল সিটিজ ইনডেক্স সেই প্রশ্নের একটি উত্তর দিয়েছে। বিশ্বের এক হাজার বড় শহরের মধ্যে এবার শীর্ষে উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক।
আর এই ফলাফল এসেছে এমন এক সময়ে, যখন শহরটির মেয়রের দায়িত্বে নতুন মুখ—জোহরান মামদানি।
নিউইয়র্ক কেন প্রথম?
অক্সফোর্ড ইকোনমিকস শহরগুলোর অবস্থান নির্ধারণে পাঁচটি বড় বিষয় বিবেচনা করেছে—অর্থনীতি, মানবসম্পদ, জীবনমান, পরিবেশ ও সুশাসন।
সব মিলিয়ে নিউইয়র্ক পেয়েছে ১০০ স্কোর। অর্থনৈতিক সক্ষমতার ক্ষেত্রে শহরটি পূর্ণ নম্বর পেয়েছে। মানবসম্পদ, জীবনমান, পরিবেশ ও সুশাসনেও নিউইয়র্কের অবস্থান ছিল শক্তিশালী।
সহজ ভাষায় বললে, নিউইয়র্ক শুধু ব্যবসা-বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র নয়; এখানে বিপুল কর্মসংস্থান, দক্ষ জনশক্তি, উন্নত নাগরিক সুবিধা এবং শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামোও রয়েছে।
লন্ডন ও প্যারিসকে পেছনে ফেলে
নিউইয়র্কের পর তালিকায় রয়েছে লন্ডন ও প্যারিস। অর্থাৎ বিশ্বের দুই ঐতিহাসিক ও প্রভাবশালী শহরকে পেছনে ফেলেই শীর্ষস্থান দখল করেছে নিউইয়র্ক।
শীর্ষ পাঁচে আরও রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের সিয়াটল ও সান ফ্রান্সিসকো। এতে বোঝা যায়, বৈশ্বিক অর্থনীতি ও মানবসম্পদের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের বড় শহরগুলোর প্রভাব এখনো কতটা শক্তিশালী।
তাহলে কি সব কৃতিত্ব মামদানির?
এখানেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা দরকার।
জোহরান মামদানি ২০২৬ সালের শুরুতে নিউইয়র্কের মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেন। এরপরই শহরটি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় শহরের স্বীকৃতি পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হওয়াটা স্বাভাবিক।
কিন্তু নিউইয়র্কের এই অবস্থানকে শুধু একজন মেয়রের সাফল্য বলা ঠিক হবে না।
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের মূল্যায়ন মূলত দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা অর্থনৈতিক শক্তি, শ্রমবাজার, মানবসম্পদ, জীবনমান, পরিবেশ ও প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর নির্ভর করে। অর্থাৎ এই র্যাংকিংয়ের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে তৈরি হওয়া একটি নগরব্যবস্থা।
নিউইয়র্কের আসল শক্তি কোথায়?
নিউইয়র্কের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো এর অর্থনীতি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক কেন্দ্র হিসেবে ওয়াল স্ট্রিট থেকে শুরু করে প্রযুক্তি, মিডিয়া, পর্যটন, সংস্কৃতি ও সেবা খাত—বিভিন্ন ক্ষেত্রেই শহরটির বড় প্রভাব রয়েছে।
এর পাশাপাশি বিভিন্ন দেশ ও সংস্কৃতির মানুষের বসবাসও নিউইয়র্ককে আলাদা বৈশ্বিক চরিত্র দিয়েছে। দক্ষ জনশক্তি ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ শহরটির অর্থনৈতিক গতিশীলতা ধরে রাখতে সাহায্য করেছে।
তবে নিউইয়র্কের সামনে চ্যালেঞ্জও কম নয়। আবাসন ব্যয়, যানজট, আয়বৈষম্য, পরিবেশগত চাপ এবং নাগরিক সেবার মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আলোচনা আছে।
একটি র্যাংকিং, নাকি ভবিষ্যতের ইঙ্গিত?
অক্সফোর্ড ইকোনমিকসের এমন সূচক শুধু আজকের অবস্থান দেখার জন্য নয়; একটি শহর ভবিষ্যতে কতটা শক্তিশালী থাকতে পারে, তারও ইঙ্গিত দেয়।
সেই দিক থেকে নিউইয়র্কের শীর্ষস্থান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এটি দেখাচ্ছে, একটি শহরের সাফল্য শুধু উঁচু ভবন বা বড় অর্থনীতির ওপর নির্ভর করে না। দক্ষ মানুষ, জীবনমান, পরিবেশ, প্রশাসন এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
জোহরান মামদানির মেয়াদকালের প্রথম বছরেই নিউইয়র্কের এই স্বীকৃতি তাই রাজনৈতিক আলোচনার পাশাপাশি নগর উন্নয়ন নিয়েও নতুন করে আগ্রহ তৈরি করেছে।
শেষ পর্যন্ত নিউইয়র্কের গল্পটি একজন মেয়রের গল্প নয়। এটি এমন এক শহরের গল্প, যে বহু দশক ধরে নিজেকে বদলে, নতুন বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে এবং বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থেকে আজও বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী নগরগুলোর একটি হয়ে আছে।

