যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র। দুই দেশের মধ্যে রয়েছে সামরিক সহযোগিতা, যৌথ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক। তাই যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কানাডায় সামরিক আগ্রাসনের সম্ভাবনা এখনো অত্যন্ত ক্ষীণ বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
তবু সাম্প্রতিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় কানাডা সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় নিজেদের প্রস্তুতি বাড়ানোর কথা বলছে। কানাডার প্রধানমন্ত্রী মার্ক কার্নিও জানিয়েছেন, সম্ভাব্য যেকোনো পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।
কেন কানাডা উদ্বিগ্ন?
কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক সহযোগিতা দীর্ঘদিনের। দুই দেশের সেনারা নিয়মিত যৌথ প্রশিক্ষণ নেয় এবং প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের ৫১তম অঙ্গরাজ্য হওয়ার বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য কানাডায় বেশ গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রে বিষয়টি অনেকের কাছে রাজনৈতিক বক্তব্য হিসেবে বিবেচিত হলেও কানাডীয়দের মধ্যে এ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তিত বাস্তবতাই কানাডাকে নিজেদের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।
হামলা হলে প্রথম ধাক্কা কেমন হতে পারে?
বিশ্লেষকদের মতে, সত্যিই যদি যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় সামরিক অভিযান শুরু করে, তাহলে প্রথম পর্যায়ে বড় ধরনের সামরিক সুবিধা থাকবে যুক্তরাষ্ট্রের।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সক্ষমতা কানাডার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে দেশটির গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান ও সামরিক স্থাপনাগুলো দ্রুত আক্রমণের মুখে পড়তে পারে।
কানাডার সামরিক বাহিনীর একটি মডেল নিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে এমন সম্ভাবনার কথা বলা হয়েছে যে, বড় ধরনের মার্কিন হামলার ক্ষেত্রে এক সপ্তাহের মধ্যেই কানাডার কিছু গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অবস্থান দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
তবে যুদ্ধের ফল শুধু প্রথম কয়েক দিনের লড়াই দিয়ে নির্ধারিত হয় না।
দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধে যেতে পারে কানাডা
নিয়মিত সামরিক শক্তিতে পিছিয়ে থাকলেও কানাডা দীর্ঘমেয়াদি প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সরাসরি মোকাবিলা কঠিন হয়ে পড়লে কানাডীয় বাহিনীকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে প্রতিরোধ, গেরিলা কৌশল এবং দীর্ঘস্থায়ী সামরিক অভিযানের দিকে যেতে হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে ফ্রান্স ও যুক্তরাজ্যের মতো মিত্র দেশগুলোর সহায়তা চাওয়ার বিষয়টিও সামনে আসতে পারে। ফলে একটি সম্ভাব্য দ্বিপক্ষীয় সংঘাত পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সংকটে রূপ নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সহজ হবে না যুদ্ধ
সামরিক শক্তিতে বড় ব্যবধান থাকলেও কানাডার বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করা যুক্তরাষ্ট্রের জন্যও সহজ সিদ্ধান্ত হবে না।
দুই দেশের সেনাবাহিনী দীর্ঘদিন ধরে একসঙ্গে কাজ করছে। নিয়মিত যৌথ প্রশিক্ষণ এবং প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কারণে দুই দেশের সামরিক বাহিনীর মধ্যে পারস্পরিক পরিচিতি ও সম্পর্ক রয়েছে।
জাতীয় নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ ম্যাথিউ শ্মিডট মনে করেন, কানাডার বিরুদ্ধে আগ্রাসনের নির্দেশ এলে যুক্তরাষ্ট্রের ভেতরেও তা নিয়ে বড় ধরনের আপত্তি তৈরি হতে পারে। তাঁর মতে, অনেক কর্মকর্তা এমন সিদ্ধান্তকে অনৈতিক বা বেআইনি হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন।
কী হতে পারে সম্ভাব্য মার্কিন লক্ষ্য?
যদি কখনো সত্যিই সামরিক সংঘাত শুরু হয়, তাহলে শুধু সামরিক ঘাঁটি বা কৌশলগত অবস্থান দখলই সম্ভাব্য লক্ষ্য নাও হতে পারে।
বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করছেন, কানাডার তেল ও খনিজসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হতে পারে। পাশাপাশি রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দুর্বল বা অকার্যকর করার বিষয়টিও সামরিক পরিকল্পনার অংশ হতে পারে।
তবে এগুলো এখন পর্যন্ত বিশেষজ্ঞদের সম্ভাব্য বিশ্লেষণ। বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্র কানাডায় সামরিক অভিযান শুরু করেছে—এমন কোনো তথ্য নেই।
কেন সামরিক সক্ষমতা বাড়াচ্ছে কানাডা?
কানাডার বর্তমান প্রস্তুতিকে সরাসরি যুদ্ধের পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন না বিশ্লেষকেরা। বরং পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বাড়ানোর অংশ হিসেবেই এটিকে দেখা হচ্ছে।
কানাডার প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা শক্তিশালী করা, সামরিক বাহিনীর আকার বাড়ানো এবং নাগরিক-সৈনিক কাঠামো সম্প্রসারণের মতো বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা চলছে।
অর্থাৎ, সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় আগেভাগে প্রস্তুতি নেওয়াই এখন কানাডার অন্যতম অগ্রাধিকার।
বাস্তবে কি যুক্তরাষ্ট্র-কানাডা যুদ্ধ সম্ভব?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এটাই। বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে কানাডায় সরাসরি সামরিক আগ্রাসনের সম্ভাবনা এখনো খুবই কম।
দুই দেশের বিশাল অর্থনৈতিক সম্পর্ক, দীর্ঘ সামরিক অংশীদারত্ব এবং পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে এমন যুদ্ধ উভয় দেশের জন্যই অত্যন্ত বড় রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করবে।
তাই কানাডার সামরিক প্রস্তুতিকে আসন্ন যুদ্ধের পূর্বাভাস না দেখে সম্ভাব্য ঝুঁকির বিরুদ্ধে সতর্কতামূলক পদক্ষেপ হিসেবে দেখা বেশি যৌক্তিক।
তবে কোনো কারণে যদি দুই দেশের মধ্যে সরাসরি সংঘাত শুরু হয়, তাহলে এর প্রভাব শুধু উত্তর আমেরিকায় সীমাবদ্ধ থাকবে না। আন্তর্জাতিক রাজনীতি, বাণিজ্য, জ্বালানি বাজার এবং বৈশ্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থাতেও বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।

