১৯৩১ সালের সেপ্টেম্বরে জার্মানির মিউনিখে অ্যাডলফ হিটলারের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে তাঁর ২৩ বছর বয়সী ভাগনি অ্যাঞ্জেলা ‘গেলি’ রাউবালের গুলিবিদ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। তৎকালীন তদন্তে তাঁর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। তবে প্রায় ৯৫ বছর পর পাওয়া কিছু পুরোনো নথি সেই ঘটনার সময়কাল ও হিটলারের অবস্থান নিয়ে নতুন প্রশ্ন তুলেছে।
গেলির বুকে গুলি লেগেছিল। যে পিস্তলটি ব্যবহার করা হয়েছিল, সেটি হিটলারের বলে জানা যায়। এত দিন প্রচলিত তথ্য ছিল, ১৯৩১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর সকালে হিটলারের মিউনিখের অ্যাপার্টমেন্ট থেকে গেলির মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই সময়রেখা অনুযায়ী, হিটলার আগের দিন ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলে মিউনিখ ছেড়ে নুরেমবার্গের উদ্দেশে রওনা হয়েছিলেন। ফলে গেলির মৃত্যুর সময় তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না—এমন ধারণাই দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
নতুন নথিতে মৃত্যুর সময় নিয়ে প্রশ্ন
জার্মান ইতিহাসবিদ হ্যারল্ড স্যান্ডনার মিউনিখের সরকারি ও আর্কাইভ নথি পর্যালোচনা করে দাবি করেছেন, গেলির মৃত্যুর সময় প্রচলিত তথ্যের সঙ্গে মিলছে না। তাঁর পাওয়া তিনটি নথিতে ১৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩১ সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে মৃত্যুর তথ্য উল্লেখ রয়েছে। আর্কাইভে পাওয়া দুটি মৃত্যুসংবাদেও ১৮ সেপ্টেম্বরের তারিখ পাওয়া গেছে।
নতুন এই তথ্য সঠিক হলে, গেলি মারা যাওয়ার সময় হিটলার মিউনিখেই ছিলেন। কারণ প্রচলিত তথ্য অনুযায়ী, ১৮ সেপ্টেম্বর বিকেলের আগে তিনি নুরেমবার্গের উদ্দেশে শহর ছাড়েননি। ফলে তাঁর দীর্ঘদিনের ‘অ্যালিবি’ বা ঘটনাস্থল থেকে দূরে থাকার সময়রেখা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
হিটলার ও গেলির সম্পর্ক
গেলি ছিলেন হিটলারের ভাগনি এবং তাঁর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে বসবাস করতেন। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে হিটলারের আচরণকে গেলির প্রতি নিয়ন্ত্রণমূলক ও অধিকারবোধপূর্ণ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তাঁদের সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে ইতিহাসে নানা দাবি ও জল্পনাও রয়েছে, যদিও সেসবের সবকিছু প্রমাণিত বা সর্বসম্মত নয়।
মৃত্যুর আগে গেলি মিউনিখ ছেড়ে অস্ট্রিয়ার ভিয়েনায় গিয়ে সংগীত নিয়ে পড়াশোনা করতে চেয়েছিলেন বলে ঐতিহাসিক বিবরণে উল্লেখ রয়েছে। এ বিষয়টি নিয়ে তাঁর সঙ্গে হিটলারের বিরোধ হয়েছিল বলেও কিছু সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
পুলিশি তদন্ত নিয়েও প্রশ্ন
স্যান্ডনারের মতে, গেলির মৃত্যুর তারিখ নিয়ে সরকারি ও পুলিশি নথিতে অসঙ্গতি থাকায় তৎকালীন তদন্তে কোনো তথ্য গোপন করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁর ধারণা, সে সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে হিটলারের ভাবমূর্তি রক্ষার চেষ্টা হয়ে থাকতে পারে।
তবে এই ব্যাখ্যাও এখনো একটি ঐতিহাসিক অনুসন্ধান ও বিতর্কের অংশ। নতুন নথি তৎকালীন তদন্তে প্রশ্ন তুললেও ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল, তা সরাসরি প্রমাণ করে না।
নতুন তথ্য কি হিটলারকে হত্যার সঙ্গে যুক্ত করে?
নতুন নথি হিটলারের প্রচলিত সময়রেখাকে প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। কিন্তু শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে হিটলার তাঁর ভাগনি গেলিকে হত্যা করেছিলেন—এমন নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না।
ইতিহাসবিদ টমাস ওয়েবারও নতুন নথিগুলোকে গুরুত্ব দিলেও হত্যার সরাসরি সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর বিষয়ে সতর্ক। তাঁর মতে, গেলির মৃত্যুর সময় হিটলার মিউনিখে ছিলেন—এ তথ্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু এটি একাই হত্যার প্রমাণ নয়।
ফলে প্রায় এক শতাব্দী পর ঘটনাটি নতুন করে আলোচনায় এলেও গেলি রাউবালের মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড, এবং এতে হিটলারের কোনো ভূমিকা ছিল কি না—তার চূড়ান্ত উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।

