সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক থেকে আমানতের মূল টাকা একসঙ্গে তুলতে গেলে মুনাফা বা অন্যান্য আর্থিক সুবিধার দাবি ছেড়ে দেওয়ার অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করতে হচ্ছে আমানতকারীদের। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ অর্থ নিয়ে ব্যাংক বা সংশ্লিষ্ট কোনো ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান কিংবা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে মামলা, অভিযোগ বা আইনি পদক্ষেপ না নেওয়ার শর্তও রাখা হয়েছে। এ নিয়ে আমানতকারীদের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে।
ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে কোনো গ্রাহক এককালীন পুরো মূল টাকা তুলতে চাইলে তাকে দুই পৃষ্ঠার একটি অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর করতে হচ্ছে। এতে বলা হয়েছে, মূল টাকা গ্রহণের পর সংশ্লিষ্ট হিসাবটি ‘সম্পূর্ণ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি’ হিসেবে বিবেচিত হবে। এরপর ওই আমানত, মুনাফা বা অন্য কোনো আর্থিক সুবিধা নিয়ে ভবিষ্যতে কোনো দাবি, অভিযোগ, মামলা, আবেদন বা আপিল করা যাবে না। একই শর্ত আমানতকারীর উত্তরাধিকারী, নমিনি ও আইনগত প্রতিনিধিদের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে। অঙ্গীকারপত্রে আমানতকারীর পাশাপাশি দুইজন সাক্ষীর স্বাক্ষরের ব্যবস্থাও রয়েছে।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে আমানত ফেরত দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করেছে। ১ থেকে ২০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১ লাখ ৭৯ হাজার ৬৮২ জন গ্রাহক মোট ৬ হাজার ৯৭৫ কোটি টাকা ফেরত চেয়ে আবেদন করেছেন। এর মধ্যে ৯০ হাজার ৯৮ জন গ্রাহক ৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা তুলে নিয়েছেন।
একই সময়ে ব্যাংকটিতে নতুন করে ২ হাজার ৭০০ কোটি টাকা আমানত জমা হয়েছে এবং ৩২ হাজার ৭৪টি নতুন হিসাব খোলা হয়েছে। এসব নতুন হিসাবে জমা হয়েছে আরও ৩৭৮ কোটি টাকা।
সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠিত হয়েছে আর্থিক অনিয়মে সংকটে পড়া পাঁচটি শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক—এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক—একীভূত করে। বর্তমানে ব্যাংকটির মালিকানা সরকারের হাতে।
২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর ঘোষিত আমানত ফেরত দেওয়ার পরিকল্পনা অনুযায়ী অর্থ ফেরত দেওয়া হচ্ছে। এর আগে বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৪ ও ২০২৫ সালের আমানতের মুনাফা পরিশোধ না করার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছিল। পরে গত ২৫ আগস্ট বাংলাদেশ ব্যাংক জানায়, সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংকের আমানতকারীদের আমানতে কোনো ‘হেয়ারকাট’ হবে না। অর্থাৎ আমানতের নির্ধারিত অংশ স্থায়ীভাবে কেটে নেওয়ার কথা নয়। তবে পুরো মূল টাকা একসঙ্গে তুলতে গেলে বর্তমানে মুনাফা ও ভবিষ্যৎ আইনি দাবির অধিকার ছাড়ার অঙ্গীকার নেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসাইন খান প্রথম আলোকে বলেন, যেসব গ্রাহক জরুরি ভিত্তিতে টাকা তুলছেন, তাঁদের ক্ষেত্রে মুনাফা আপাতত আটকে রাখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট ঋণগ্রহীতারা মূল টাকা ও মুনাফাসহ অর্থ ফেরত দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আমানতকারীরা মুনাফাসহ বাকি অর্থ তুলতে পারবেন বলে জানান তিনি।
তবে অঙ্গীকারপত্রে স্বাক্ষর নেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ জানিয়েছেন কয়েকজন আমানতকারী। তাঁদের অভিযোগ, নিজের আমানতের মূল টাকা তুলতে গিয়ে ভবিষ্যতের সব দাবি ও আইনি প্রতিকারের অধিকার ছেড়ে দেওয়ার শর্ত গ্রহণ করা হচ্ছে।
ব্যাংক সূত্র আরও জানিয়েছে, ব্যক্তিগত মেয়াদি আমানত ও বিভিন্ন স্কিমভিত্তিক আমানতের মুনাফার হার পুনর্নির্ধারণ এবং হিসাব পুনর্গণনার কাজ চলছে। মৃত আমানতকারীদের অর্থ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই শেষে বৈধ উত্তরাধিকারী বা দাবিদারদের দেওয়ার ব্যবস্থা করতে বলা হয়েছে। ব্লক করা হিসাবও যাচাই শেষে আনব্লক করে টাকা উত্তোলনের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

