আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেশটির সংবাদমাধ্যমের দীর্ঘদিনের বিরোধ আবারও তীব্র হয়েছে। সম্প্রতি CNN, MS NOW ও Politico-র সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসে প্রবেশে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর হয়েছে। ট্রাম্প এসব সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনকে ‘ফেক নিউজ’ বলে সমালোচনা করে এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। ১৯ সেপ্টেম্বর সংশ্লিষ্ট সাংবাদিকরা হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করতে গেলে তাঁদের প্রেস ব্যাজ নিষ্ক্রিয় বা জব্দ করা হয়।
ট্রাম্পের এই পদক্ষেপকে সংবাদমাধ্যমগুলো সমালোচনা করেছে এবং আইনি পদক্ষেপের সম্ভাবনার কথাও জানিয়েছে। সংবাদস্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন ও বিশেষজ্ঞরাও এর সাংবিধানিক দিক নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মতামত বা প্রতিবেদনভিত্তিক কারণে সংবাদমাধ্যমকে সরকারি প্রবেশাধিকার থেকে বাদ দেওয়া মার্কিন সংবিধানের প্রথম সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে—এমন যুক্তি সামনে এসেছে।
কেন সংবাদমাধ্যমের ওপর ক্ষুব্ধ ট্রাম্প
ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই তাঁর সমালোচনামূলক সংবাদ পরিবেশনকারী বিভিন্ন গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রকাশ্য বিরোধে রয়েছেন। নতুন নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়ার সময়ও তিনি সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর কভারেজকে নিজের ভাষায় ‘ফেক নিউজ’ বলে উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও সংবাদমাধ্যম এমন নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়তে পারে বলেও তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন।
শনিবার CNN, MS NOW ও Politico-র সাংবাদিকরা হোয়াইট হাউসে কাজে যাওয়ার পর তাঁদের প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। সাংবাদিকদের প্রেস ব্যাজ নিষ্ক্রিয় বা জব্দ করা হয়। পরে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলো জানায়, তারা এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে নিজেদের অধিকার রক্ষায় আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছে।
সাংবিধানিক প্রশ্ন
মার্কিন আইনি ও সংবাদমাধ্যম-সংশ্লিষ্ট মহলে মূল প্রশ্ন উঠেছে, একজন প্রেসিডেন্ট তাঁর কভারেজ পছন্দ না হওয়ায় কোনো নির্দিষ্ট সংবাদমাধ্যমকে সরকারি ভবনে প্রবেশ থেকে বাদ দিতে পারেন কি না।
Reuters-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুক্ত সাংবাদিকতার সাংবিধানিক সুরক্ষার সঙ্গে এ ধরনের পদক্ষেপের সংঘাত হতে পারে বলে মত দিয়েছেন স্বাধীনতা ও মতপ্রকাশের অধিকারবিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। AP-ও জানিয়েছে, ট্রাম্পের ঘোষণার পর থেকেই সংবাদস্বাধীনতা ও প্রথম সংশোধনী নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়েছে।
তবে হোয়াইট হাউসের পক্ষ থেকে ট্রাম্পের সিদ্ধান্তের কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদন ও কভারেজকেই সামনে আনা হয়েছে। অর্থাৎ, প্রশাসনের বক্তব্য অনুযায়ী এটি সংবাদ কভারেজের মান ও নির্ভরযোগ্যতার প্রশ্ন; সমালোচকেরা আবার এটিকে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার ওপর চাপ হিসেবে দেখছেন।
বিরোধের দীর্ঘ ইতিহাস
ট্রাম্পের সঙ্গে মার্কিন সংবাদমাধ্যমের বিরোধ নতুন নয়। তাঁর প্রথম মেয়াদ থেকেই বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে প্রকাশ্য সংঘাত তৈরি হয়েছে। দ্বিতীয় মেয়াদেও প্রশাসনের সঙ্গে কয়েকটি বড় সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার ও কভারেজ নিয়ে বিরোধ অব্যাহত রয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনায় CNN, MS NOW ও Politico-কে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত সেই দীর্ঘ বিরোধকে আরও প্রকাশ্য পর্যায়ে নিয়ে গেছে। এর আগে Associated Press-এর সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকার নিয়েও ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে আইনি বিরোধ হয়েছিল।
রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রে নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এখনো রিপাবলিকান পার্টিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ধরে রেখেছেন। একই সময়ে তাঁর প্রশাসনের অর্থনীতি, জ্বালানির মূল্য এবং বিভিন্ন নীতি নিয়ে দেশটির অভ্যন্তরে বিতর্ক রয়েছে।
ট্রাম্পের সমালোচকেরা মনে করেন, সংবাদমাধ্যমকে আক্রমণ করার মতো পদক্ষেপ রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু বদলে দিতে পারে। অন্যদিকে ট্রাম্প ও তাঁর সমর্থকেরা দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ করে আসছেন, কিছু সংবাদমাধ্যম তাঁর প্রশাসনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্টভাবে খবর প্রকাশ করে।
ফলে বর্তমান বিরোধটি শুধু হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের প্রবেশাধিকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসের স্বাধীনতা, সরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের সম্পর্ক এবং প্রথম সংশোধনীর সুরক্ষা নিয়ে আরও বড় বিতর্ক তৈরি করেছে।

