ক্যাম্পাস প্রতিবেদক
‘তুমি বড় হয়ে কী হতে চাও?’—প্রশ্নটি খুব পরিচিত। কিন্তু এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট উত্তর সবার কাছে থাকে না। বিশেষ করে এইচএসসি শেষ হওয়ার পর অনেক শিক্ষার্থীর সামনে একসঙ্গে এতগুলো সম্ভাবনার দরজা খুলে যায় যে কোন পথে এগোবেন, সেটিই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।
১২ বছরের নিয়মিত পড়াশোনা, পরীক্ষার রুটিন ও পরিচিত পরিবেশ হঠাৎ শেষ হয়ে যায় এইচএসসির সঙ্গে। তারপর শুরু হয় ভর্তি প্রস্তুতির দৌড়। আশপাশে তাকালে মনে হয়, প্রায় সবাই যেন নিজের ভবিষ্যৎ ঠিক করে ফেলেছে। কেউ ছোটবেলা থেকেই চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে মেডিকেলের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, কেউ এসএসসির পর থেকেই প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের লক্ষ্য ঠিক করেছেন, আবার কেউ নির্দিষ্ট কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্নকে নিজের পরিচয়ের অংশ করে ফেলেছেন।
আর যাঁরা এখনো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননি, তাঁদের জন্য সময়টা হয়ে ওঠে আরও চাপের।
‘কোথায় ভর্তি পরীক্ষা দিচ্ছ?’, ‘মেডিকেল না বুয়েট?’, ‘কোন বিশ্ববিদ্যালয়?’—আত্মীয়স্বজন, বন্ধু কিংবা পরিচিতদের এসব প্রশ্ন খুব স্বাভাবিক। কিন্তু নিজের কাছে যখন উত্তর থাকে না, তখন সাধারণ প্রশ্নও চাপ বা জিজ্ঞাসাবাদের মতো মনে হতে পারে।
এইচএসসি পরীক্ষার পর যেন থামার সুযোগ নেই। ভর্তি কোচিংয়ের প্রচার, বন্ধুদের প্রস্তুতি, সামাজিক প্রত্যাশা—সবকিছু মিলিয়ে শিক্ষার্থীর মনে হতে পারে, সে হয়তো ইতিমধ্যে পিছিয়ে পড়েছে।
কিন্তু যে জীবন এখনো শুরুই হয়নি, সেখানে পিছিয়ে পড়ার ধারণাটিই বা কতটা যৌক্তিক?
সাফল্যের ধারণা যখন সীমিত হয়ে যায়
বাংলাদেশের অনেক পরিবারে ছোটবেলা থেকেই ‘সফল’ ভবিষ্যতের একটি নির্দিষ্ট ছবি তৈরি করে দেওয়া হয়। মেডিকেল কলেজ, শীর্ষ প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান কিংবা নামী পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়—এই গুটিকয়েক গন্তব্যকেই নিরাপদ ও সম্মানজনক ভবিষ্যতের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।
এ পথগুলো বেছে নেওয়ার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। অনেক শিক্ষার্থী সত্যিই এসব বিষয়ে আগ্রহী এবং নিজেদের পছন্দ থেকেই এই পথ নির্বাচন করেন।
সমস্যা তৈরি হয় তখন, যখন নিরাপত্তাকে সাফল্যের সমার্থক মনে করা শুরু হয়। পরিচিত পথের বাইরে যাওয়াকে তখন ঝুঁকি বা ভুল সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়।
ফলে যে শিক্ষার্থী এখনো নিজের আগ্রহ বা লক্ষ্য নিয়ে নিশ্চিত নয়, সেও অনেক সময় অন্যদের দেখাদেখি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। বাবা-মাকে হতাশ করার ভয়, ভুল বিষয় বেছে নেওয়ার আশঙ্কা কিংবা আত্মীয়-প্রতিবেশীর মন্তব্য—সব মিলিয়ে নিজের ইচ্ছার বদলে অন্যের প্রত্যাশাই সিদ্ধান্তের চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
অন্যের স্বপ্ন নয়, নিজের পথ
একজন তরুণকে জীবনের লক্ষ্য ঠিক করতে বলা হয় এমন এক বয়সে, যখন সে নিজেই এখনো নিজেকে চিনে উঠছে। এখানেই সবচেয়ে বড় দ্বন্দ্ব।
অবশ্যই একসময় সিদ্ধান্ত নিতেই হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে আবেদনের সময়সীমা আছে, ভর্তি পরীক্ষা আছে, একটি পর্যায়ে সম্ভাবনার তালিকা থেকে একটি পথ বেছে নিতে হয়। কিন্তু সিদ্ধান্ত নেওয়ার অর্থ এই নয় যে প্রথম সিদ্ধান্তটিই জীবনের শেষ সিদ্ধান্ত।
বরং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে নিজের আগ্রহ, সক্ষমতা ও সম্ভাব্য ভবিষ্যৎ সম্পর্কে যত বেশি জানা যায়, সিদ্ধান্ত তত বেশি বাস্তবসম্মত হয়।
সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কী করবেন?
কোনো একটি ডিগ্রির নাম শুনেই সিদ্ধান্ত না নিয়ে প্রথমে বোঝার চেষ্টা করা দরকার, সেই বিষয়ে আসলে কী পড়ানো হয়। কোর্সের বিষয়বস্তু কী, পড়াশোনা শেষে কী ধরনের পেশায় যাওয়া যায় এবং সেই পেশার বাস্তব কাজ কেমন—এসব সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া জরুরি।
যে ক্ষেত্রগুলো নিয়ে আগ্রহ আছে, সেসব বিষয়ে পড়াশোনা বা কাজ করছেন এমন মানুষের সঙ্গে কথা বলা যেতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স কাঠামো, ক্যারিয়ার সম্ভাবনা এবং বাস্তব অভিজ্ঞতা সম্পর্কে তাঁদের কাছ থেকে জানা অনেক ভুল ধারণা দূর করতে পারে।
নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহ থাকলে মত পরিবর্তনের সুযোগও রাখতে হবে। নতুন কিছু জানার পর আগের সিদ্ধান্ত বদলে ফেলা ব্যর্থতা নয়; বরং নিজের জন্য উপযুক্ত পথ খুঁজে পাওয়ার অংশ।
মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণাতেও দেখা গেছে, সময়ের সঙ্গে মানুষ অনেক সময় করা কাজের চেয়ে না-করা কাজ নিয়ে বেশি আক্ষেপ করে। অর্থাৎ শুধু ভুল হওয়ার ভয়েই কোনো সম্ভাবনাকে পুরোপুরি এড়িয়ে যাওয়া ভবিষ্যতে বড় আক্ষেপের কারণ হতে পারে।
একটু সময় নেওয়া মানেই পিছিয়ে পড়া নয়
এইচএসসির পর কেউ দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে পারে, আবার কারও একটু বেশি সময় লাগতে পারে। দুটির কোনোটিই নিজে থেকে সঠিক বা ভুল নয়।
গুরুত্বপূর্ণ হলো, শেষ পর্যন্ত যে পথটি বেছে নেওয়া হবে, সেটি যেন কেবল সামাজিক চাপ, আত্মীয়ের পরামর্শ কিংবা অন্যদের সাফল্যের অনুকরণে নেওয়া না হয়।
জীবনের শুরুতেই সবার পথ এক হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই। কারও পথ সরল হবে, কারও পথ ঘুরে যাবে। কেউ খুব দ্রুত নিজের পছন্দ খুঁজে পাবে, কেউ কয়েকবার চেষ্টা করে বুঝবে কোন কাজটি তার জন্য নয়।
নিজের জীবন নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় তাই সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হতে পারে—‘সবাই কী করছে?’ নয়, বরং ‘আমি কেন এই পথটি বেছে নিচ্ছি?’
