আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা এবং দলটির নেতাকর্মীদের বিচারের দাবিতে প্রকাশ্যে সরব বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। একই সময়ে স্থানীয় পর্যায়ের আওয়ামী লীগ নেতা, ব্যবসায়ী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নিজেদের রাজনৈতিক বলয়ে টানতে তিন দলের মধ্যেই এক ধরনের প্রতিযোগিতা চলছে—এমন অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে সামনে রেখে এই তৎপরতা আরও জোরালো হয়েছে বলে রাজনৈতিক অঙ্গনের সংশ্লিষ্টদের দাবি। অভিযোগ রয়েছে, কোথাও মামলা থেকে রক্ষা, কোথাও ব্যবসা ও সম্পদ সুরক্ষা, আবার কোথাও নির্বাচনী হিসাবকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করছে বিভিন্ন দলের নেতারা।
প্রাডো গাড়ি ঘিরে এনসিপি নেতাকে নিয়ে আলোচনা
গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা-চট্টগ্রাম লং মার্চ কর্মসূচিতে এনসিপি নেতা নাসীরউদ্দিন পাটওয়ারীর একটি প্রাডো গাড়ি ব্যবহারের ছবি ও ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কর্মসূচির একটি পথসভায় কয়েকজন যুবক গাড়িটির মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন তুললে পাটওয়ারী রসিকতা করে মালিকের নাম প্রকাশ করলে তা ‘ধ্বংস’ হয়ে যাবে বলে মন্তব্য করেন।
পরে সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো তথ্যের ভিত্তিতে গাড়িটির মালিক হিসেবে মাদারীপুর সদর উপজেলার সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মনিরুল ইসলাম তুষার ভূঁইয়ার নাম সামনে আসে। এ নিয়ে নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়। তবে গাড়ি ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর্থিক বা রাজনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগ স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়ার তথ্য এই প্রতিবেদনে নেই।
অর্থসহায়তার অভিযোগ
গণঅধিকার পরিষদের মুখপাত্র আবু হানিফ ৭ সেপ্টেম্বর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক পোস্টে দাবি করেন, নাসীরউদ্দিন পাটওয়ারী যে গাড়ি ব্যবহার করেছেন সেটি আওয়ামী লীগ নেতা তুষারের। একই পোস্টে তিনি এনসিপির কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগঘনিষ্ঠ ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অর্থ নেওয়া এবং বিভিন্ন ব্যক্তিকে দলটিতে যুক্ত করার বিনিময়ে আর্থিক সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তোলেন।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য এবং স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রমাণ এই কপিতে পাওয়া যায়নি। তাই অভিযোগগুলোকে অভিযোগ হিসেবেই দেখা প্রয়োজন।
আওয়ামী লীগবিরোধী বক্তব্য, অন্যদিকে যোগাযোগ
কপিটির দাবি অনুযায়ী, বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপি প্রকাশ্যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে দলটির নেতাদের বিচারের দাবি করছে। একই সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা, ব্যবসায়ী ও সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার অভিযোগও রয়েছে। সামনে ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা পরিষদ, পৌরসভা ও সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই যোগাযোগ আরও বাড়ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে ঘিরে সাবেক মেয়র মোহাম্মদ মনজুর আলমকে এনসিপির প্রার্থী করার সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়েছে। এ বিষয়ে এনসিপির পক্ষ থেকে সম্মতির দাবি এলেও মনজুর আলম নিজে একাধিকবার বিষয়টি নিয়ে সিদ্ধান্ত না নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
জামায়াতে যোগদানের আহ্বান
আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের জামায়াতে যোগ দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে দলটির নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য অধ্যাপক লতিফুর রহমানের বক্তব্যও আলোচনায় এসেছে। তিনি আওয়ামী লীগ থেকে যারা জামায়াতে যোগ দেবেন, তাদের দায়িত্ব নেওয়ার এবং মামলা, থানা ও আদালতসংক্রান্ত বিষয়েও পাশে থাকার কথা বলেছিলেন বলে একাধিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।
তবে এ বক্তব্যের পর জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়, লতিফুর রহমানের মন্তব্য তার ব্যক্তিগত মতামত; এটি দলের আনুষ্ঠানিক অবস্থান নয়। দলটি এ বিষয়ে তাকে সতর্কও করেছে।
বিভিন্ন এলাকায় দলবদল
প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়েছে, দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলায় আওয়ামী লীগ ও বিএনপির স্থানীয় পর্যায়ের নেতাকর্মীদের একটি অংশ জামায়াতে যোগ দিচ্ছেন। চুয়াডাঙ্গায় গত বছরের ৭ ডিসেম্বর ১০২ জন বিএনপি ও আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর জামায়াতে যোগ দেওয়ার ঘটনাও উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংকের একটি অংশকে নিজেদের দিকে টানতে বিভিন্ন দল মাঠপর্যায়ে সক্রিয় হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগে সরগরম রাজনীতি
আওয়ামী লীগের ভোট ও মাঠপর্যায়ের নেতাদের দলে টানার চেষ্টা নিয়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে পরস্পরবিরোধী বক্তব্যও দেখা যাচ্ছে। জামায়াতের মহাসচিব মিয়া গোলাম পরওয়ার বিএনপি ও সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ তুলেছেন। অন্যদিকে এনসিপির নেতারাও আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের বিরুদ্ধে সতর্কবার্তা দিয়েছেন বলে কপিটিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
একই সময়ে আওয়ামী লীগের একটি অংশও রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকা, মামলা থেকে রেহাই পাওয়া কিংবা নিজেদের ব্যবসা ও সম্পদ রক্ষার স্বার্থে নতুন রাজনৈতিক আশ্রয় খুঁজছে—এমন বিশ্লেষণ উঠে এসেছে। তবে এসব রাজনৈতিক যোগাযোগের সবগুলোকে একই ধরনের দলবদল বা আনুষ্ঠানিক রাজনৈতিক পুনর্বাসন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে, আওয়ামী লীগকে প্রকাশ্যে কঠোরভাবে মোকাবিলার পাশাপাশি দলটির স্থানীয় পর্যায়ের ভোটব্যাংক, নেতা ও অর্থনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি হচ্ছে। আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে এই সমীকরণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

