নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা
টানা চার বছর কমার পর আবার বেড়েছে বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এ খাত থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে প্রায় ৮৮ কোটি মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। গত তিন অর্থবছরের মধ্যে এটিই পাট ও পাটজাত পণ্যের সর্বোচ্চ রপ্তানি।
তবে পাট রপ্তানির এই প্রবৃদ্ধিকে পুরোপুরি খাতটির বিকাশ বলা যাচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের মতে, গত বছর বন্যায় পাট উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় কাঁচা পাটের দাম বেড়েছে। ফলে পাটজাত পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ার কারণে অর্থের হিসাবে রপ্তানি বেড়েছে, কিন্তু পণ্যের পরিমাণে তেমন প্রবৃদ্ধি হয়নি।
বাংলাদেশ পাট উৎপাদনে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম দেশ। প্রতিবছর দেশে প্রায় ৯ কোটি বেল পাট উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উপযুক্ত উদ্যোগ নেওয়া গেলে পাটজাত পণ্যের রপ্তানি ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করার সম্ভাবনা রয়েছে।
কাঁচা পাটের রপ্তানি কমেছে
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কাঁচা পাট রপ্তানি কমে হয়েছে ১৩ কোটি ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১১ শতাংশ কম। পরিমাণের হিসাবে কাঁচা পাট রপ্তানি কমেছে প্রায় ৭৭ শতাংশ। গত অর্থবছরে কাঁচা পাট রপ্তানি হয়েছে ৩৮ হাজার টন, আগের বছর যা ছিল ১ লাখ ৬৭ হাজার টন।
অন্যদিকে পাটের বস্তা রপ্তানি ৫ শতাংশ বেড়ে ১৩ কোটি ডলারে দাঁড়িয়েছে। পাটের সুতা রপ্তানি বেড়েছে ১৮ শতাংশ, আয় হয়েছে প্রায় ৪৯ কোটি ডলার। তবে পরিমাণের হিসাবে পাটের সুতা রপ্তানি ২ শতাংশ কমেছে।
বাংলাদেশের পাট ও পাটজাত পণ্যের প্রধান বাজারগুলোর মধ্যে রয়েছে তুরস্ক, চীন, ভারত, মিসর, উজবেকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া, মরক্কো, সংযুক্ত আরব আমিরাত, জর্ডান, পাকিস্তান, রাশিয়া ও ইরান।
কাঁচামালের দাম নিয়ে চাপ
বাংলাদেশ জুট স্পিনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি তপাস প্রামাণিক বলেন, গত অর্থবছরে প্রতি মণ কাঁচা পাট কিনতে হয়েছে প্রায় ৫ হাজার ৫০০ থেকে ৬ হাজার টাকা, যেখানে আগের বছর দাম ছিল ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকা। কাঁচামালের দাম বাড়ায় পাটজাত পণ্যের উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
তাঁর মতে, কাঁচামালের সরবরাহব্যবস্থা স্বাভাবিক করা গেলে এবং নতুন বাজারে রপ্তানি বাড়াতে প্রণোদনা দেওয়া হলে পাট ও পাটজাত পণ্যের রপ্তানি আয় দুই থেকে তিনশ কোটি ডলারে নেওয়া সম্ভব।
বহুমুখী পাটপণ্যে বড় সম্ভাবনা
বাংলাদেশের পাট খাতের সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনা রয়েছে বহুমুখী পাটপণ্যে। এসব পণ্যের মধ্যে রয়েছে শপিং ব্যাগ, গৃহসজ্জা সামগ্রী, প্রযুক্তিনির্ভর টেক্সটাইল, পোশাক, প্যাকেজিং ও বাগানসংশ্লিষ্ট পণ্য। বিভিন্ন দেশে পাটকাঠি থেকে তৈরি চারকোলেরও চাহিদা রয়েছে।
তবে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বহুমুখী পাটপণ্য রপ্তানি হয়েছে ৭ কোটি ৪৪ লাখ ডলার, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ১১ শতাংশ কম।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ইরান যুদ্ধের প্রভাবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বহুমুখী পাটপণ্যের ক্রয়াদেশ ২০ থেকে ২৫ শতাংশ কমেছে। একই সঙ্গে কাঁচা পাটের দাম বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বেড়েছে।
রপ্তানি বাড়াতে নতুন পণ্য উদ্ভাবন, গবেষণা, মান উন্নয়ন এবং এ খাতে বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন উদ্যোক্তারা। তাঁদের মতে, কাঁচা পাট ও কম মূল্য সংযোজনের পণ্যের পাশাপাশি উচ্চমূল্যের বহুমুখী পাটপণ্যের উৎপাদন বাড়াতে পারলে বিশ্ববাজারে বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।

