ঢাকা, ২৩ আগস্ট ২০২৬: জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক বিভাজন কমানো এবং অতীতের সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্য উদ্ঘাটনে ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ বা ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল দেশের প্রধান কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তবে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এ নিয়ে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ বা রাজনৈতিক আলোচনা হয়নি।
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচনের ইশতেহারে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেয়। বিএনপি ও জামায়াত ‘ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন’ এবং এনসিপি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের কথা বলেছে।
বিএনপির ইশতেহারে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ন্যায়বিচারের মাধ্যমে একটি ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশন গঠনের কথা বলা হয়েছে। দলটির মতে, এর মাধ্যমে অতীতের মানবাধিকার লঙ্ঘনের সত্য উদ্ঘাটন, দায়ীদের জবাবদিহি এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রতিকার নিশ্চিত করার পথ তৈরি হতে পারে।
জামায়াতে ইসলামীও ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক ও পুনর্বাসনমূলক ট্রুথ অ্যান্ড হিলিং কমিশনের প্রস্তাব করেছে। দলটির ইশতেহারে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন এবং জাতিসংঘের কারিগরি সহায়তা নেওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে।
অন্যদিকে এনসিপির ইশতেহারে সরাসরি ‘ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন’ গঠনের প্রতিশ্রুতি রয়েছে। দলটি আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ের মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিভিন্ন গুরুতর অপরাধের সত্য উদ্ঘাটনের পাশাপাশি জবাবদিহি নিশ্চিত করার কথা বলেছে।
ইশতেহারেই সীমাবদ্ধ প্রতিশ্রুতি
রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে বিষয়টি থাকলেও এখন পর্যন্ত কমিশন গঠনের বাস্তব প্রক্রিয়া শুরু হয়নি। সাম্প্রতিক আলোচনায় বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, বিষয়টি দলের ইশতেহারে রয়েছে এবং অন্য প্রতিশ্রুতির মতো এটিও ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা হবে।
জামায়াতের মহাসচিব মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য অনুযায়ী, এটি এমন একটি কাজ যা সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার পর বাস্তবায়ন করতে হবে এবং এ জন্য সময় প্রয়োজন।
এনসিপির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অতীতের ভুল স্বীকার ও দায় স্বীকারের মতো মৌলিক বিষয়গুলো সমাধান না হলে কার্যকর পুনর্মিলন প্রক্রিয়া কঠিন। দলটির নেতারা মনে করেন, রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরি করতে সত্য উদ্ঘাটনের পাশাপাশি দায়বদ্ধতার প্রশ্নও নিষ্পত্তি করতে হবে।
আগেও উঠেছিল কমিশন গঠনের আলোচনা
অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ও ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন গঠনের আলোচনা হয়েছিল। ২০২৫ সালে তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দল, শিক্ষার্থী নেতৃত্ব ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনার কথা বলেছিলেন। তবে শেষ পর্যন্ত কোনো কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়নি।
এর আগে ২০১৮ সালের জাতীয় নির্বাচনের সময় জাতীয় ঐক্যফ্রন্টও অতীতের রাজনৈতিক হয়রানি ও সংঘাত নিরসনে সর্বদলীয় সত্য অনুসন্ধান ও বিরোধ নিষ্পত্তির কমিশন গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিল।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এই কমিশন?
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে রাজনৈতিক সহিংসতা, গুম, হত্যা, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। কেবল বিচারিক প্রক্রিয়া নয়, অতীতের ঘটনাগুলোর সত্য প্রকাশ, ভুক্তভোগীদের স্বীকৃতি ও ক্ষতিপূরণ এবং ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সহাবস্থানের পরিবেশ তৈরির জন্য আলাদা একটি প্রক্রিয়া প্রয়োজন হতে পারে।
দক্ষিণ আফ্রিকার ট্রুথ অ্যান্ড রিকনসিলিয়েশন কমিশন এ ধরনের উদ্যোগের বহুল আলোচিত উদাহরণ। দেশটির বর্ণবাদবিরোধী রূপান্তরের পর কমিশন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা অনুসন্ধান, ভুক্তভোগীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং জাতীয় পুনর্মিলনের প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এমন কোনো কমিশন কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করবে এর কাঠামো, স্বাধীনতা, আইনি ভিত্তি, ভুক্তভোগীদের অংশগ্রহণ এবং রাজনৈতিক দলগুলোর বাস্তব অঙ্গীকারের ওপর।
এখন বড় প্রশ্ন—নির্বাচনী ইশতেহারে থাকা প্রতিশ্রুতি কবে বাস্তব উদ্যোগে রূপ নেবে। রাজনৈতিক বিভাজন কমিয়ে জাতীয় ঐক্যের পথে এগোতে হলে ‘রিকনসিলিয়েশন’ নিয়ে ইশতেহারের বাইরেও কার্যকর আলোচনা ও সিদ্ধান্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

