অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিষিদ্ধ মাদক বিক্রির অভিযোগে ঢাকার বাড্ডা থেকে এক কেমিস্টকে গ্রেপ্তার করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর (DNC)। অভিযানে বিপুল পরিমাণ THC-যুক্ত তরল, মাদক প্রস্তুত ও প্যাকেজিংয়ের সরঞ্জামসহ বিভিন্ন সামগ্রী উদ্ধার করা হয়েছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত ব্যক্তি অনলাইন প্ল্যাটফর্মে ‘CBD Oil’ ও ‘Aromatic Oil’ নামে THC-যুক্ত তরল বিক্রি করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
কীভাবে ধরা পড়ল অনলাইনে মাদক বিক্রির বিষয়টি?
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর গোপন তথ্যের ভিত্তিতে জানতে পারে, দীর্ঘদিন ধরে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে নিষিদ্ধ THC-যুক্ত তরল বিক্রি করা হচ্ছে।
বিষয়টি যাচাই করতে কর্মকর্তারা ক্রেতা সেজে পণ্যটির অর্ডার করেন। পরে সংগ্রহ করা তরল রাসায়নিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। পরীক্ষায় এতে THC-এর উপস্থিতি পাওয়া যায়।
এরপর তদন্তকারীরা আবার তিনটি বোতলে মোট ৬০ মিলিলিটার তরলের অর্ডার করেন। নির্ধারিত সময়ে একজন ডেলিভারি কর্মী পণ্যটি নিয়ে এলে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।
তদন্তে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে কর্মকর্তারা বাড্ডার সাতারকুল এলাকার একটি বাসায় অভিযান চালান।
বাড্ডার বাসা থেকে কী উদ্ধার হয়েছে?
অভিযানে মোহাম্মদ আনিসুর রহমান নামে ৪০ বছর বয়সী এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বাসাটিতে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধার করা হয়—
- ৬২০ মিলিলিটার THC-যুক্ত তরল
- মাদক প্রস্তুত ও প্যাকেজিংয়ের বিভিন্ন সরঞ্জাম
- ৫০টি ছোট কাচের বোতল
- পলিথিন প্যাকেট
- কম্পিউটার
- মোবাইল ফোন
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হিসাবে উদ্ধার করা THC-এর আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৬০ লাখ টাকা।
পাঁচ বছরে প্রায় ৪০৫ বোতল বিক্রির অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনিসুর রহমান দীর্ঘদিন ধরে অনলাইনে এই পণ্য বিক্রি করছিলেন। গত পাঁচ বছরে প্রায় ৪০৫ বোতল THC বিক্রির তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি তদন্তকারীদের।
অভিযোগ অনুযায়ী, নিষিদ্ধ তরলটি ছোট বোতলে ভরে ‘CBD Oil’ বা অন্যান্য তেলের নামে অনলাইনে বিক্রি করা হতো।
তদন্তকারীদের দাবি, এসব পণ্য অবৈধভাবে দেশে আনার পর অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ক্রেতাদের কাছে সরবরাহ করা হতো।
ডেলিভারি কর্মীকে কেন গ্রেপ্তার করা হয়নি?
তদন্তের সময় সংশ্লিষ্ট ডেলিভারি কর্মীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি কর্মকর্তাদের জানান, একটি পার্সেল সরবরাহের জন্য তিনি নির্ধারিত ঠিকানায় গিয়েছিলেন এবং পার্সেলের ভেতরে কী ছিল তা তার জানা ছিল না।
তদন্তকারীরা তার সরাসরি বা পরোক্ষভাবে মাদক ব্যবসায় জড়িত থাকার প্রমাণ না পাওয়ায় তাকে গ্রেপ্তার করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
দারাজের বক্তব্য
ঘটনার বিষয়ে দারাজ বাংলাদেশ জানিয়েছে, পণ্যের নিরাপত্তা, প্রচলিত আইন মেনে চলা এবং গ্রাহকদের আস্থা রক্ষা করাকে তারা সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে অভিযোগ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট পণ্যটি প্ল্যাটফর্ম থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে এবং বিক্রেতার বিরুদ্ধে নীতিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
একই সঙ্গে একই ধরনের নিষিদ্ধ পণ্য শনাক্ত ও সরিয়ে দিতে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং যাচাই কার্যক্রম জোরদার করার কথাও জানিয়েছে দারাজ।
কেমিস্ট থেকে মাদক ব্যবসায় জড়ানোর অভিযোগ
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আনিসুর রহমান পেশায় একজন কেমিস্ট। পড়াশোনা শেষে তিনি জাপানে গিয়েছিলেন। দেশে ফিরে হাতে তৈরি সাবান তৈরি ও বিক্রির ব্যবসা শুরু করেন।
পরবর্তীতে সেই ব্যবসার আড়ালে মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন বলে তদন্তকারীদের দাবি। বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পাঁচ বছরেরও বেশি সময় ধরে এসব পণ্য বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অনলাইনে মাদক বিক্রি ঠেকাতে নজরদারি
বর্তমানে অনলাইন প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে বিভিন্ন পণ্য সহজে ক্রয়-বিক্রয় করা যায়। এই সুযোগের অপব্যবহার করে নিষিদ্ধ পণ্য বিক্রির অভিযোগও সামনে আসছে।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, অনলাইনে মাদক কেনাবেচা বন্ধ করতে নিয়মিত নজরদারি চালানো হচ্ছে। নতুন এই অভিযানও অনলাইনভিত্তিক মাদক ব্যবসার বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরদারির বিষয়টি সামনে এনেছে।
বাড্ডার ঘটনায় মামলা
ঘটনাটি নিয়ে বাড্ডা থানায় মামলা করা হয়েছে। মামলায় গ্রেপ্তার আনিসুর রহমানসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।
অনলাইনে নিষিদ্ধ মাদক বিক্রির অভিযোগে এই অভিযান ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে আইন ও প্ল্যাটফর্ম নীতিমালা মেনে চলার গুরুত্বও তুলে ধরেছে।

