বারবার দাম সমন্বয় করেও নিয়ন্ত্রণে আসছে না দেশের তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) বাজার। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি মূল্যেই ১২ কেজির গ্যাস সিলিন্ডার কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। চলতি নভেম্বর মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ২ হাজার ৬০ টাকা নির্ধারণ করা হলেও বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায়।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ চিত্র উঠে এসেছে।
বিইআরসি গত অক্টোবর ও নভেম্বরে দুই দফায় এলপিজির দাম বাড়িয়েছে। পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের বিভিন্ন পর্যায়ের কমিশনও বাড়ানো হয়েছে। এরপরও বাজারে শৃঙ্খলা ফেরেনি। দেড় মাসের বেশি সময় ধরে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস বিক্রির অভিযোগ করছেন ক্রেতারা।
দুই মাসে দুই দফা দাম বৃদ্ধি
বাজার পরিস্থিতি অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের নির্ধারিত দাম ছিল ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। কিন্তু তখন বাজারে সেটি ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছিল।
পরে অক্টোবরে বিইআরসি ২৫২ টাকা বাড়িয়ে দাম নির্ধারণ করে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা। এরপর নভেম্বরে আরও ২২৩ টাকা বাড়িয়ে ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম নির্ধারণ করা হয় ২ হাজার ৬০ টাকা।
তবে দাম বাড়ানোর পরও বাজারে নির্ধারিত মূল্য কার্যকর হয়নি। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় এখনো ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
সরবরাহ সংকটের অভিযোগ ব্যবসায়ীদের
রাজধানীর খুচরা বিক্রেতা, এলপিজি গ্রাহক ও পরিবেশকদের অভিযোগ, বাজারে এখনো পর্যাপ্ত সরবরাহ নেই। কোম্পানিগুলো চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করছে না। ফলে নির্ধারিত দামে অনেক কোম্পানির সিলিন্ডার পাওয়া যাচ্ছে না।
খুচরা বিক্রেতাদের দাবি, আগে ডিলাররা দোকানে গ্যাসভর্তি সিলিন্ডার পৌঁছে দিতেন। এখন ডিলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করেও সময়মতো সিলিন্ডার পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
তাদের ভাষ্য, কয়েকটি কোম্পানির ১২ কেজির সিলিন্ডারই কিনতে হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ২৫০ টাকায়। পরিবহন ও অন্যান্য খরচ যোগ করে সেগুলো ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৪০০ টাকায় বিক্রি করতে হচ্ছে।
বনশ্রীর একটি রেস্তোরাঁর ব্যবস্থাপক জানান, তারা এখনো ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডার ২ হাজার ৪০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায় কিনছেন। তার অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দাম বাস্তবে কার্যকর হচ্ছে না।
চাহিদার তুলনায় বেশি আমদানি, তবুও সংকট
বাজারে সরবরাহ সংকটের কথা বলা হলেও আমদানির পরিসংখ্যানে ভিন্ন চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন, সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং অক্টোবরে প্রায় একই পরিমাণ এলপিজি আমদানি হয়েছে।
অথচ দেশে প্রতি মাসে এলপিজির চাহিদা ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ১ লাখ ৫০ হাজার টন। অর্থাৎ আমদানির পরিমাণ মাসিক চাহিদার চেয়ে বেশি ছিল।
এ অবস্থায় বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। আমদানিকারক ও সিলিন্ডারজাতকারী প্রতিষ্ঠানগুলো সরবরাহ স্বাভাবিক থাকার দাবি করলেও ডিলার, পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে বেশি দামে বিক্রির অভিযোগ করছে।
তিন কোম্পানির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, অন্তত তিনটি কোম্পানি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। এসব কোম্পানি সরাসরি আমদানি না করে অন্য আমদানিকারকদের কাছ থেকে গ্যাস কিনে বোতলজাত করছে। তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
একজন এলপিজি পরিবেশকের দাবি, কয়েকটি কোম্পানির প্ল্যান্ট থেকেই ১২ কেজির সিলিন্ডার নির্ধারিত দামের চেয়ে ৯০ থেকে ২৪০ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। বিষয়টি বিইআরসিকে জানানো হয়েছে।
দেশে প্রায় এক কোটি মানুষ রান্নার কাজে এলপিজি ব্যবহার করেন। ফলে নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে গ্যাস কিনতে হওয়ায় সাধারণ পরিবার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ব্যয় বাড়ছে। এখন গ্রাহকদের প্রত্যাশা, বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক করার পাশাপাশি নির্ধারিত দামে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।

