একসময় ব্যালন ডি’অরের মঞ্চে ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারদের ছিল দাপট। রোনালদো নাজারিও, রিভালদো, রোনালদিনিও ও কাকার মতো তারকারা নিজেদের অসাধারণ নৈপুণ্যে জিতেছেন ফুটবলের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ ব্যক্তিগত পুরস্কার। কিন্তু সেই সময় এখন অতীত। সর্বশেষ ২০০৭ সালে ব্রাজিলের কাকা ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন। এরপর কেটে গেছে ১৯ বছর, অথচ আর কোনো ব্রাজিলিয়ান ফুটবলারের হাতে ওঠেনি এই পুরস্কার।
প্রশ্ন উঠছে, পাঁচবারের বিশ্বকাপজয়ী ব্রাজিল কেন এখন আর আগের মতো বিশ্বসেরা ফুটবলার তৈরি করতে পারছে না?
১৯ বছর ধরে ব্যালন ডি’অর অধরা
ব্রাজিলের ফুটবলের সোনালি সময়ের কথা উঠলে রোনালদো, রিভালদো, রোনালদিনিও ও কাকার নাম সবার আগে আসে। ১৯৯৬ থেকে ২০০৭ সালের মধ্যে ব্রাজিলিয়ানরা পাঁচবার ব্যালন ডি’অর জিতেছিলেন।
কিন্তু ২০০৭ সালে কাকার জয়ের পর থেকে পরিস্থিতি বদলে যায়। এরপর নেইমার ২০১৫ ও ২০১৭ সালে ব্যালন ডি’অরের সংক্ষিপ্ত তালিকার শীর্ষ তিনে জায়গা করে নেন। ২০২৪ সালে দ্বিতীয় হয়েছিলেন ভিনিসিয়ুস জুনিয়র। কিন্তু কেউই পুরস্কার জিততে পারেননি।
সর্বশেষ আসরে ভিনিসিয়ুস ১৭তম স্থানে ছিলেন। ফলে একসময় যে দেশ ব্যক্তিগত পুরস্কারের মঞ্চে নিয়মিত আধিপত্য দেখাত, এখন সেখানে ব্রাজিলের প্রতিনিধিত্ব অনেকটাই সীমিত।
নেইমার ও ভিনিসিয়ুসের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা
কাকার পর ব্রাজিলের ফুটবলপ্রেমীরা সবচেয়ে বেশি আশা করেছিলেন নেইমারকে ঘিরে। প্রতিভা, ড্রিবলিং ও আক্রমণাত্মক খেলায় তিনি ছিলেন অসাধারণ। তবে মাঠের পারফরম্যান্সে লিওনেল মেসি ও ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর ধারাবাহিকতার সমান উচ্চতায় পৌঁছাতে পারেননি তিনি।
নেইমারের পর ভিনিসিয়ুস জুনিয়রকে ঘিরে তৈরি হয় নতুন প্রত্যাশা। ২০২৪ সালে ব্যালন ডি’অরে দ্বিতীয় হওয়া এবং একই বছর ফিফা দ্য বেস্ট পুরস্কার জেতা তাঁকে ব্রাজিলের বড় তারকা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
কিন্তু একটি দেশের বিশ্বসেরা হওয়ার স্বপ্ন শুধু একজন বা দুজন খেলোয়াড়ের ওপর নির্ভর করে পূরণ করা কঠিন। রাফিনিয়া ও এস্তেভাওয়ের মতো নতুন প্রতিভা উঠে এলেও তাঁদের ঘিরে এখনই বড় প্রত্যাশা তৈরি করা সময়ের আগে হয়ে যেতে পারে।
প্রতিভা তৈরির কাঠামোতে সংকট
ব্রাজিলের ফুটবলারদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে বয়সভিত্তিক ফুটবলার তৈরির ব্যবস্থার দুর্বলতার কথা তুলে ধরেছেন বিশেষজ্ঞরা।
ক্রীড়া বিপণন ও খেলাধুলায় উদ্ভাবনবিষয়ক বিশেষজ্ঞ আলেকজান্দ্রে ভাসকনসেলোসের মতে, বিশ্বমানের সৃষ্টিশীল মিডফিল্ডার, ফুলব্যাক ও সেন্টার ফরোয়ার্ড তৈরিতে যে ঘাটতি দেখা যাচ্ছে, তা ফুটবলার উন্নয়নের কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দেয়।
তাঁর মতে, বয়সভিত্তিক পর্যায় থেকে ফুটবলার তৈরির ব্যবস্থা নতুন করে সাজানো জরুরি। তবে এ ধরনের পরিবর্তনের সুফল আন্তর্জাতিক ফুটবলে দেখতে সময় লাগবে।
ব্রাজিলিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের একাডেমির অধ্যাপক ও কোচ রজার মাচাদোও মনে করেন, আন্তর্জাতিক ফুটবলে প্রতিযোগিতা আগের চেয়ে অনেক বেড়েছে। ফ্রান্স, স্পেন, জার্মানি ও পর্তুগালের মতো দেশগুলো দক্ষ ফুটবলার তৈরিতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে।
হারিয়ে যাচ্ছে রাস্তার ফুটবলের জাদু?
ব্রাজিলিয়ান ফুটবলের ঐতিহ্য ছিল গলি, সমুদ্রসৈকত ও খোলা মাঠের স্বতঃস্ফূর্ত ফুটবল। এসব জায়গায় খেলতে খেলতেই অনেক প্রতিভাবান খেলোয়াড় ড্রিবলিং, সৃজনশীলতা ও বল নিয়ন্ত্রণের অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করতেন।
ব্রাজিলের কিংবদন্তি স্ট্রাইকার রোমারিওর মতে, ফুটবলার তৈরির পরিবেশ বদলে যাওয়ায় তরুণদের সহজাত সৃজনশীলতা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, আগের সেই রাস্তার ফুটবলে খেলোয়াড়েরা বাঁধাধরা কৌশলের বাইরে নিজেদের প্রতিভা প্রকাশের সুযোগ পেতেন।
এখন ফুটবলে গতি, শক্তি ও শারীরিক সক্ষমতার গুরুত্ব বেড়েছে। ফলে কেবল সৃজনশীলতা দিয়ে সর্বোচ্চ পর্যায়ে টিকে থাকা আরও কঠিন হয়ে উঠেছে। রোমারিওর মতে, এই পরিবর্তনও ব্রাজিলের সহজাত প্রতিভা বিকাশে প্রভাব ফেলছে।
মেসি-রোনালদোর যুগও ছিল বড় চ্যালেঞ্জ
নেইমারের ক্যারিয়ারের একটি বড় অংশ কেটেছে মেসি ও রোনালদোর আধিপত্যের সময়ে। প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে দুজনের অসাধারণ ধারাবাহিকতা ব্যালন ডি’অরের প্রতিযোগিতাকে কঠিন করে তুলেছিল।
২০১৮ সালে লুকা মদরিচ তাঁদের আধিপত্যে বড় ধাক্কা দিলেও ব্রাজিলের কোনো খেলোয়াড় সেই সময় পুরস্কারটি জিততে পারেননি।
তবে শুধু মেসি-রোনালদোর আধিপত্য দিয়ে ব্রাজিলের দীর্ঘ খরা ব্যাখ্যা করা যায় না। ফুটবলার তৈরির কাঠামো, আধুনিক ফুটবলের পরিবর্তিত চাহিদা এবং বিশ্বমানের খেলোয়াড় তৈরিতে অন্য দেশগুলোর অগ্রগতিও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
বিশ্বকাপজয়ী দেশ, তবু বিশ্বসেরার পুরস্কার অধরা
ব্রাজিল পাঁচবার বিশ্বকাপ জিতেছে। দেশটি প্রতিবছর ইউরোপের বিভিন্ন ক্লাবে অসংখ্য ফুটবলার সরবরাহ করে। তারপরও ব্যালন ডি’অরের মতো ব্যক্তিগত পুরস্কারে ব্রাজিলের উপস্থিতি কমে যাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে, বিপুল প্রতিভার ভিড় থেকে বিশ্বসেরাদের পর্যায়ে পৌঁছাচ্ছেন কতজন?
বিশেষজ্ঞদের বক্তব্যে মূলত দুটি বিষয় উঠে এসেছে—নতুন প্রজন্মের প্রতিভা বিকাশের কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করা এবং সৃজনশীল ফুটবলের ঐতিহ্য ধরে রাখা।
ব্রাজিলের সামনে তাই চ্যালেঞ্জ শুধু আরেকজন নেইমার বা ভিনিসিয়ুস তৈরি করা নয়; বরং এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে নিয়মিতভাবে বিশ্বমানের ফুটবলার উঠে আসবেন। সেই পরিবর্তন কতটা সফল হয়, তা দেখার অপেক্ষায় ফুটবলবিশ্ব।

