মাহুয়া রউফ, গবেষক, লেখক ও জিওট্যুরিস্ট
সমুদ্রপথে যাত্রা করতে একসময় মানুষ সমুদ্রের দেবতা পোসেইডনের অনুমতির কথা ভাবত। তবে অস্ট্রেলিয়ার সিডনি থেকে বিমানে ভানুয়াতু যাওয়ায় সেই ঝুঁকি নিতে হয়নি। প্রায় তিন ঘণ্টার বিমানযাত্রার পর পৌঁছাই দেশটির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর পোর্ট ভিলায়।
বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই দেশটির জীবনযাত্রার খরচের বিষয়টি চোখে পড়ে। ট্যাক্সিভাড়া থেকে শুরু করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম—সবকিছুই বেশ বেশি মনে হয়েছে। রাস্তার দুই পাশে মানুষের বসতি কম, যানবাহনও সীমিত। স্থানীয়ভাবে ১১ আসনের ছোট মাইক্রোবাসকে ‘বাস’ বলা হয়।
ভানুয়াতু ৮৩টি দ্বীপের একটি দ্বীপদেশ। দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরের এই দেশটির জনসংখ্যা প্রায় তিন লাখ। ছোট দেশ হলেও ভাষার বৈচিত্র্য অত্যন্ত বেশি। এখানে প্রায় ১১২টি স্বতন্ত্র ভাষা প্রচলিত। একসময় এক দ্বীপের মানুষ অন্য দ্বীপের ভাষা বুঝতে পারতেন না। পরে যোগাযোগের সুবিধায় ‘বিসলামা’ নামে একটি সাধারণ ভাষার বিস্তার ঘটে।
প্রায় এক সপ্তাহ দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে মনে হয়েছে, ভানুয়াতুর সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্যগুলোর একটি তার ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য।
প্রকৃতি ও মানুষের জীবন
রাস্তার পাশে শিশুদের দেখে বোঝা যায়, তখন স্কুলে ছুটি চলছে। মেয়েদের পরনে স্কার্ট, ছেলেদের পরনে শর্টস ও শার্ট। রোদে পোড়া ত্বক আর তাদের জীবনযাপনের ধরন দেখে মনে হয়েছে—সমুদ্র, বন, আগ্নেয়গিরি ও মাটির সঙ্গে তাদের জীবন গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
দেশটিতে বায়ুদূষণের তেমন চিহ্ন চোখে পড়েনি। কোথাও কোথাও জনবসতি এতটাই কম যে চারপাশে প্রকৃতিই বেশি দৃশ্যমান।
ইংরেজি-ফরাসি প্রভাব
ভানুয়াতুতে ইংরেজ ও ফরাসিরা প্রায় একই সময়ে এসে উপনিবেশ স্থাপন করে। দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ থাকলেও দীর্ঘ সময় ধরে তারা দ্বীপগুলো ভাগ করে শাসন করেছে। ১৯৮০ সালে স্বাধীনতা লাভ করে ভানুয়াতু।
দেশটিতে ইংরেজি ও ফরাসি—দুই ভাষাই শিক্ষাব্যবস্থা ও প্রশাসনে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি নীতির অংশ হিসেবে বিদ্যালয়গুলোতে উভয় ভাষাই পড়ানো হয়।
নিরাপত্তা নিয়ে স্থানীয়দের ধারণা
নিরাপত্তা নিয়ে কথা বললে স্থানীয় ট্যাক্সিচালক ফিলিপ জানান, তাঁর দেশে চুরি বা ছিনতাইয়ের ঘটনা নেই বললেই চলে। সন্ধ্যার পর নারীদের নিরাপত্তা নিয়েও জানতে চেয়েছিলাম। তাঁর ভাষ্য, সন্ধ্যায় সৈকতে হাঁটলেও সাধারণত কেউ বিরক্ত করে না।
তবে ভ্রমণকারীর নিজের অভিজ্ঞতা থেকে নিরাপত্তার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ সীমিত—এ বিষয়টি মাথায় রাখাও জরুরি।
বাজার ঘিরে জীবন
ভানুয়াতুর দৈনন্দিন জীবনের বড় অংশজুড়ে রয়েছে স্থানীয় বাজার। কাসাভা, তারো, ইয়ামসহ নানা ধরনের ফল ও সবজি বাজারে সাজানো থাকে। বাজারগুলো বেশ পরিচ্ছন্ন ও গোছানো।
এখানে নারীরাই অনেক পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করেন। নিজেদের শ্রমে উৎপাদিত পণ্য বিক্রি করে তাঁরা আয় করেন এবং সেই আয়ের ওপর নিজেদের অধিকার রয়েছে।
পানির নিচে পোস্ট অফিস
হাইডঅ্যাওয়ে আইল্যান্ডে গিয়ে দেখা মেলে ভিন্নধর্মী এক অভিজ্ঞতার। এখানে পানির নিচে একটি পোস্ট অফিস রয়েছে। ওয়াটারপ্রুফ পোস্টকার্ড কিনে প্রায় ১৫ ফুট পানির নিচে নেমে সেটি নির্দিষ্ট স্থানে জমা দিতে হয়। এরপর ডুবুরিরা সেই পোস্টকার্ড পৌঁছে দেন।
‘নাকামাল’ ও কাভা
ভানুয়াতুর ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ‘চিফস নাকামাল’। ‘চিফস’ বলতে স্থানীয় গোষ্ঠীর নেতাদের বোঝানো হয় আর ‘নাকামাল’ হলো সম্প্রদায়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত ও আলোচনা করার জায়গা।
আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থার পাশাপাশি এই ঐতিহ্য এখনো টিকে আছে। নাকামালের ছাদ প্রায় মাটির কাছাকাছি, আর এর কাঠামো ‘এ-ফ্রেম’ ধরনের হওয়ায় এটি ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধী বলেও স্থানীয়ভাবে বিবেচিত।
এখানে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার সময় ‘কাভা’ নামে একটি বিশেষ পানীয় পান করার রীতি রয়েছে। স্থানীয় সংস্কৃতিতে এর আলাদা গুরুত্ব রয়েছে।
খাবার ও সংস্কৃতি
এক রাতে স্থানীয়দের জাতীয় খাবার হিসেবে পরিচিত ‘লাপালাপ’ খাওয়ার সুযোগ হয়। কাসাভা, তারো, ইয়াম ও মাংস একসঙ্গে মিশিয়ে কলাপাতায় মুড়ে তৈরি করা হয় এই খাবার।
পেপেও কালচারাল ভিলেজে স্থানীয় মানুষদের ঐতিহ্যবাহী পোশাকে তাঁদের পূর্বপুরুষদের জীবনযাপন ও সংস্কৃতি পর্যটকদের সামনে তুলে ধরতে দেখা যায়।
ভানুয়াতুর আরেকটি আকর্ষণীয় ঐতিহ্য হলো বালুর ওপর জ্যামিতিক নকশা আঁকা। দূরের একটি সৈকতে এক শিল্পীকে ‘রেইনবো সার্পেন্ট’-এর মতো নকশা আঁকতে দেখেছিলাম।
স্থানীয় সংস্কৃতির একটি লোককথায় কাঠের মূর্তি ও নাচের সঙ্গে জীবন্ত হয়ে ওঠার গল্পও রয়েছে। এসব বিশ্বাস ও ঐতিহ্য দ্বীপদেশটির সংস্কৃতিকে আরও বৈচিত্র্যময় করে তুলেছে।
সেপ্টেম্বরের ৯ তারিখে ভানুয়াতু থেকে ফিজির উদ্দেশে রওনা হওয়ার সময় মনে হচ্ছিল, অল্প কয়েক দিনের এই সফরেও ৮৩ দ্বীপের দেশটির প্রকৃতি, মানুষ ও সংস্কৃতির কত রকম গল্প সঙ্গে নিয়ে ফিরছি।
